Advertisement

প্রতিদিন শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামে পেতে পারেন দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক উপকার

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
প্রতিদিন শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামে পেতে পারেন দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক উপকার
ছবি : সংগৃহীত

প্রাচীন চর্চা থেকে উঠে আসা ‘ব্রেথওয়ার্ক’ বা সচেতনভাবে শ্বাস নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান এখন নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিনিট শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দিলেও তা শুধু তাৎক্ষণিক মানসিক চাপ কমায় না, দীর্ঘমেয়াদেও শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে।

শ্বাস নেওয়া আমাদের জীবনের প্রথম এবং শেষ কাজ। শরীর স্বাভাবিকভাবেই প্রতি মিনিটে বহুবার শ্বাস নেয়, যাতে আমরা বেঁচে থাকতে পারি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেক সময় শরীরকে ‘ঠিকভাবে’ শ্বাস নিতে সাহায্য করলে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়।

এ ধারণাকেই বলা হয় ‘ব্রেথওয়ার্ক’ (breathwork), যার অর্থ শ্বাসচর্চা বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম। হাজার বছর ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতিতেও এর চর্চা রয়েছে। ভারতের প্রণায়াম থেকে শুরু করে চীনের চিগং; সব ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য হলো সচেতনভাবে শ্বাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মন ও শরীরকে শান্ত করা।

অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির গবেষক অ্যাবি লিটল বলেন, শ্বাসচর্চা হলো এমন একটি প্রাচীন অভ্যাস, যা এখন আধুনিক সময়ে নতুন ধরনের ‘মাইন্ডফুলনেস হ্যাক’ হিসেবে ফিরে আসছে।’

তবে অন্তঃসত্ত্বা নারী বা অ্যাজমা, সিওপিডির মতো শ্বাসজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের এসব ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শ্বাসচর্চা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা স্ট্রেস শরীরে নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। উদ্বেগ, হতাশা, হৃদরোগ এমনকি ক্যানসারের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত স্ট্রেস ক্ষতিকর হতে পারে।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডেভিড স্পিগেল বলেন, ‘শ্বাস নিয়ন্ত্রণের ব্যায়াম অনেকটা মেডিটেশন বা হিপনোসিসের মতো কাজ করে। এতে মন বাইরের চাপ থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে শরীরের দিকে মনোযোগ দেয়।’

এ ছাড়া ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে সাহায্য করে। মুখ দিয়ে দ্রুত ও অগভীর শ্বাস নিলে শরীর ‘স্ট্রেস মোডে’ চলে যায়। বিপরীতে নাক দিয়ে ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নিলে শরীর শান্ত হয় এবং ‘রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট’ অবস্থায় যায়।

১. সাইক্লিক সাইং (Cyclic Sighing)

এটি ধীরে ও সচেতনভাবে শ্বাস নেওয়ার একটি পদ্ধতি। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিট এই ব্যায়াম করলে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমতে পারে।

এ পদ্ধতিতে প্রথমে নাক দিয়ে গভীর শ্বাস নিতে হবে। এরপর ফুসফুস পুরোপুরি ভরাতে আরেকটি ছোট শ্বাস নিতে হবে। তারপর মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে দীর্ঘ সময় নিয়ে শ্বাস ছাড়তে হবে।

ডেভিড স্পিগেল বলেন, লম্বা সময় ধরে শ্বাস ছাড়ার ফলে মস্তিস্ক শরীরকে ধীর ও শান্ত হওয়ার সংকেত দেয়।

২. বক্স ব্রিদিং (Box Breathing)

এটি এমন একটি শ্বাসপ্রশ্বাসের কৌশল, যেখানে শ্বাস নেওয়া, ধরে রাখা, শ্বাস ছাড়া এবং আবার ধরে রাখা; সব ধাপ সমান সময় ধরে করা হয়।

এই পদ্ধতি মনোযোগ বাড়াতে ও চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নেভি সিল সদস্যরাও চাপের মুহূর্তে এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন।

কীভাবে করবেন

৪ সেকেন্ড শ্বাস নিন

৪ সেকেন্ড ধরে রাখুন

৪ সেকেন্ড শ্বাস ছাড়ুন

আবার ৪ সেকেন্ড ধরে রাখুন

এভাবে কয়েক মিনিট চালিয়ে যান।

৩. ৪-৭-৮ ব্রিদিং

উদ্বেগ কমাতে জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি হলো ৪-৭-৮ ব্রিদিং।

এতে:

৪ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিন

৭ সেকেন্ড ধরে রাখুন

৮ সেকেন্ড ধরে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন

গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতি উদ্বেগ কমাতে কার্যকর হতে পারে।

৪. কোহেরেন্ট ব্রিদিং (Coherent Breathing)

এটি তুলনামূলক উন্নত একটি শ্বাসপ্রশ্বাস পদ্ধতি। এতে ধীরে ও ছন্দময়ভাবে শ্বাস নিতে হয়।

প্রথমে আরামদায়কভাবে বসুন বা শুয়ে পড়ুন। নাক দিয়ে ধীরে ৫ সেকেন্ড শ্বাস নিন, এরপর ৫ সেকেন্ড ধরে শ্বাস ছাড়ুন। লক্ষ্য থাকবে প্রতি মিনিটে প্রায় ৬ বার শ্বাস নেওয়া।

গবেষকদের মতে, এটি হৃদস্পন্দনের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সাহায্য করে, যা স্ট্রেস কমাতে ও স্নায়ুতন্ত্রকে আরও নমনীয় করতে সহায়ক হতে পারে।

৫. A52 ব্রিদিং পদ্ধতি

এটি কোহেরেন্ট ব্রিদিংয়ের মতোই, তবে এতে একটি অতিরিক্ত ধাপ আছে।

প্রথমে:

৫ সেকেন্ড নাক দিয়ে শ্বাস নিন

৫ সেকেন্ড ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন

এরপর ২ সেকেন্ড শ্বাস বন্ধ রাখুন

তারপর আবার একইভাবে চালিয়ে যান।

মনে রাখবেন, নিয়মিত চর্চাই মূল বিষয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো ব্রেথওয়ার্ক পদ্ধতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিত চর্চা। প্রতিদিন মাত্র ৩ থেকে ৫ মিনিটও উপকার দিতে পারে।

অ্যাবি লিটল বলেন, ‘নাক দিয়ে ধীরে, নরমভাবে এবং পেট পর্যন্ত শ্বাস নিন। এই ছোট পরিবর্তনই আপনার জীবনকে দ্রুত ভালো দিকে বদলে দিতে পারে।’

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, কাজের চাপ বা মানসিক ক্লান্তি—যাই থাকুক না কেন, সচেতন শ্বাস-প্রশ্বাসের অভ্যাস হতে পারে সহজ কিন্তু কার্যকর একটি উপায়।

সূত্র: বিবিসি