মা-মেয়ের গল্পে গ্রিক পুরাণে ঋতু বদলের আখ্যান

গ্রিক পুরাণ নিয়ে আপনি কতটুকু জানেন, তা এই লেখা পড়ার আগে কিছুটা হলেও জরুরি। খানিকটা জানা থাকলে ভালো, না থাকলেও অনেকটা মাসুদ রানার বইগুলোর মতো বলা যায়—‘সিরিজের অন্য বইগুলো পড়া না থাকলেও বুঝতে পারবেন।’ গ্রিক মিথোলজি এমন এক বিষয়, যেখানে মর্ত্যের মানুষ আর ঐশ্বরিক দেব-দেবীরা পারস্পরিক গল্পে এবং সম্পর্কে যুক্ত হয়েছেন। এসব আখ্যানের মাঝেই দুই চরিত্র হেডিস এবং পার্সেফোনি। তবে এই গল্পের সঙ্গে রয়েছে এক সন্তানের জন্য অদম্য এক মায়ের গল্প, যার নাম ডেমিটার। আর এই পুরো গল্পের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে ঋতু পরিবর্তনের এক বিচিত্র আখ্যান।
অনেক বছর আগে যখন অলিম্পাসের দেবতারা স্বর্গের শাসন করতেন এবং মানুষের বিশ্বাস ছিল যে প্রতিটি পাহাড়, নদী, বন আর সমুদ্রে দেবশক্তির উপস্থিতি রয়েছে, তখন বাস করতেন এক তরুণী দেবী—পার্সেফোনি। তিনি ছিলেন কৃষি, শস্য, উর্বর ভূমি ও ফসলের দেবী ডেমিটারের একমাত্র আদরের মেয়ে এবং দেবরাজ জিউসের কন্যা।
জিউস বজ্র ও বিদ্যুতের শক্তি দিয়ে আকাশ শাসন করতেন। ডেমিটার পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার করতেন। তিনি যেখানে পা রাখতেন, সেখানেই ফুটে উঠত রঙিন ফুল, পেকে যেত সোনালি গম, ফলে ভরে উঠত গাছপালা। পৃথিবীর মানুষের কাছে তিনি ছিলেন জীবন ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
পার্সেফোনির ছিলেন বসন্ত, তারুণ্য এবং নতুন জীবনের প্রতীক। তার স্বভাব ছিল কোমল, দয়ালু ও কৌতূহলী। দিনের বেশির ভাগ সময় তিনি সবুজ ঘাসে ঢাকা প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতেন, নানা রঙের ফুল তুলতেন এবং তার সঙ্গীদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কাটাতেন। তিনি মায়ের ভীষণ আদরের ছিলেন, এতটাই যে মা তাকে নজরে রাখতেন সবসময়। তার মনে সবসময় এক ধরনের অজানা আশঙ্কা কাজ করত। যেন এক দিন পৃথিবীর কোনো অশুভ শক্তি তার মেয়ের ক্ষতি করতে পারে।
পৃথিবীর অনেক গভীরে ছিল আরেকটি রহস্যময় রাজ্য, যা পৃথিবীর অন্য সব জায়গা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সেটিই ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ড বা মৃতদের রাজ্য। মানুষের মৃত্যু হলে তাদের আত্মা এই রাজ্যে এসে পৌঁছাত বলে বিশ্বাস করা হতো। এই অন্ধকার রাজ্যের শাসক ছিলেন হেডিস। তিনি ছিলেন টাইটান ক্রোনাস ও রিয়ার তিন পুত্রের একজন।
টাইটানদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ও ভয়ংকর যুদ্ধ জয়ের পর তিন ভাই নিজেদের মধ্যে মহাবিশ্ব ভাগ করে নেন। জিউস পান আকাশের শাসনভার, পোসাইডন পান সমুদ্রের অধিকার, আর হেডিসের ভাগে আসে আন্ডারওয়ার্ল্ড। মৃতদের রাজা হওয়ার কারণে অনেকেই হেডিসকে ভয় পেতেন। তবে তিনি মৃত্যুর দেবতা ছিলেন না। সেই দায়িত্ব ছিল থানাটোসের। হেডিসের কাজ ছিল মৃতদের রাজ্য শাসন করা এবং জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা।
অন্য অলিম্পিয়ান দেবতাদের মতো হেডিস খুব কমই অলিম্পাস পর্বতে যেতেন। তিনি নিজের নীরব রাজ্যেই থাকতেন এবং কঠোর হলেও ন্যায়ের সঙ্গে শাসন করতেন। তার প্রাসাদ ছিল অপূর্ব। পৃথিবীর গভীরে থাকা কালো পাথর ও মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি সেই রাজপ্রাসাদ ছিল বিস্ময়কর। তার রাজ্যের মধ্য দিয়ে বয়ে যেত স্টিক্স, অ্যাকারন, কোকাইটাস, ফ্লেজেথন ও লেথে নামের রহস্যময় নদীগুলো। মৃত আত্মাদের স্টিক্স নদী পার করে দিতেন ফেরিওয়ালা ক্যারন। আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রবেশদ্বার পাহারা দিত ভয়ংকর তিন মাথাওয়ালা কুকুর সারবেরাস। তার দায়িত্ব ছিল যেন কোনো আত্মা সেই রাজ্য থেকে পালিয়ে যেতে না পারে।
অসীম ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও হেডিসের জীবন ছিল নিঃসঙ্গ। প্রতিদিন অসংখ্য মৃত আত্মা তার রাজ্যে এসে পৌঁছাত, কিন্তু তার পাশে বসে রাজ্য শাসন করার মতো কোনো সঙ্গী ছিল না। একদিন হেডিস পৃথিবীর উপরে উঠে এলেন। প্রাচীন কাহিনিতে স্পষ্ট করে বলা হয়নি কেন তিনি এসেছিলেন। তবে সেই সময়ই তার চোখে পড়ে পার্সেফোনি।
এই গল্পের শুরু অনেকটা এখান থেকেই।
সবুজ ঘাসে ঢাকা এক ফুলের প্রান্তরে সঙ্গীদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন পার্সেফোনি। পাহাড়জুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল তার হাসি। পার্সেফোনির সৌন্দর্য দেখে প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হয়ে যান হেডিস। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, পার্সেফোনিকেই তিনি নিজের রানি করবেন। এই ইচ্ছা নিয়ে তিনি জিউসের কাছে যান। গ্রিক পুরাণের কিছু সংস্করণে বলা হয়েছে, হেডিস আনুষ্ঠানিকভাবে জিউসের কাছে পার্সেফোনিকে বিয়ে করার অনুমতি চেয়েছিলেন।
জিউস জানতেন, ডেমিটার কখনোই স্বেচ্ছায় নিজের মেয়েকে পৃথিবী ছেড়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে যেতে দেবেন না। আবার তার এটাও মনে হয়েছিল যে, হেডিসেরও একজন স্ত্রী থাকা উচিত। তাই তিনি সরাসরি সম্মতি দিলেন না, আবার না-ও বললেন না। তিনি নীরব থাকলেন। হেডিস সেই নীরবতাকেই সম্মতি হিসেবে ধরে নিলেন। এই গোপন সমঝোতার কথা ডেমিটার বা পার্সেফোনি কেউই জানতেন না।
কয়েক দিন বাদে পার্সেফোনি আগের চেয়ে একটু বেশি দূরে চলে গেলেন তার সঙ্গীদের সঙ্গে। প্রাচীন গ্রন্থ হোমেরিক হিম টু ডেমিটার অনুযায়ী, তখন পৃথিবী নিজেই এক অসাধারণ সুন্দর ফুল ফুটিয়ে তোলে। পরবর্তী কিছু কাহিনিতে বলা হয়েছে, সেটি ছিল শত শত পাপড়িওয়ালা এক বিরল নার্সিসাস ফুল, যা জিউসের নির্দেশে পৃথিবীর দেবী গাইয়া সৃষ্টি করেছিলেন। ফুলটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পার্সেফোনি ধীরে ধীরে তার সঙ্গীদের থেকে দূরে সরে গেলেন। তিনি ফুলটি তুলতে হাত বাড়াতেই হঠাৎ মাটি কেঁপে উঠল। পরের মুহূর্তেই প্রচণ্ড গর্জনে পৃথিবী ফেটে গেল। অন্ধকার সেই ফাটল থেকে বেরিয়ে এল একটি কালো রথ। অমর ঘোড়ায় টানা সেই রথে দাঁড়িয়ে ছিলেন হেডিস। তার মাথায় ঝলমলে সোনার মুকুট।
পার্সেফোনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই হেডিস তাকে তুলে নিলেন নিজের রথে। ভয়ে ও আতঙ্কে পার্সেফোনি মায়ের নাম ধরে চিৎকার করতে লাগলেন। তিনি জিউসের কাছেও সাহায্য চাইলেন। তার কান্না পাহাড় আর উপত্যকায় প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। কিন্তু ততক্ষণে হেডিস তাকে নিয়ে পৃথিবীর গভীরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। এরপর মুহূর্তের মধ্যেই মাটি আবার আগের মতো জোড়া লেগে গেল। চারদিকে এমন নীরবতা নেমে এলো, যেন কিছুই ঘটেনি।

প্রিয় পাঠক, আপনি যদি এতটা সময় এটিকে মিষ্টি একটি প্রেমের গল্প ভেবে থাকেন, ব্যাপারটা ঠিক তেমন না, বোধ করি বুঝে গেছেন।
পার্সেফোনির সেই অসহায় আর্তনাদ শুনতে পেয়েছিল মাত্র দুজন দেবতা। প্রথমজন ছিলেন হেকেটে। তিনি ছিলেন রাত, জাদুবিদ্যা, চৌরাস্তা ও রহস্যের দেবী। তিনি পার্সেফোনির চিৎকার শুনেছিলেন, কিন্তু কে তাকে নিয়ে গেল তা দেখতে পাননি। দ্বিতীয়জন ছিলেন সূর্যদেব হেলিওস। প্রতিদিন আকাশজুড়ে তার রথ ছুটে চলত, আর সেই উচ্চতা থেকে পৃথিবীর কোনো ঘটনাই তার চোখ এড়াত না।
এদিকে পার্সেফোনিকে খুঁজে না পেয়ে ডেমিটার দিশেহারা হয়ে পড়লেন। তিনি বুঝতেই পারছিলেন না, তার মেয়ে কোথায় হারিয়ে গেল। পরপর নয় দিন এবং নয় রাত তিনি পাহাড়, বন, নদী, উপত্যকা, মাঠ, প্রান্তর, এমনকি জনপদে ঘুরে বেড়ালেন। দুই হাতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে তিনি নিরন্তর খুঁজে চললেন প্রিয় কন্যাকে। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি না খেয়েছেন, না বিশ্রাম নিয়েছেন। শুধু একটাই লক্ষ্য ছিল, যেভাবেই হোক পার্সেফোনিকে খুঁজে বের করতে হবে। পৃথিবীর মানুষ, পশুপাখি, এমনকি দেবতারাও তার এই অসীম শোকের সাক্ষী ছিলেন।
দশম দিনে হেকেট এসে ডেমিটারের সঙ্গে দেখা করলেন। তিনি জানালেন, পার্সেফোনির কান্না তিনি শুনেছিলেন, কিন্তু অপহরণকারীকে দেখেননি। এরপর দুজনে একসঙ্গে গেলেন হেলিওসের কাছে। সবকিছু নিজের চোখে দেখা সূর্যদেব আর সত্য গোপন করলেন না। তিনি শান্ত কণ্ঠে জানালেন, হেডিস পার্সেফোনিকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিয়ে গেছেন। আর এই ঘটনায় জিউসেরও নীরব সম্মতি ছিল।
এই কথা শুনে ডেমিটারের পৃথিবী যেন ভেঙে পড়ল। নিজের ভাই হেডিস এবং স্বামী জিউস, দুজনের কাছ থেকেই তিনি নিজেকে প্রতারিত মনে করলেন। অভিমান আর শোকে তিনি অলিম্পাস ছেড়ে চলে গেলেন। দেবতাদের সঙ্গও ত্যাগ করলেন। এরপর তিনি নিজের পরিচয় গোপন করে এক বৃদ্ধার রূপ ধারণ করলেন। সেই ছদ্মবেশে তার নাম ছিল দোসো।
একা একা পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে তিনি পৌঁছালেন প্রাচীন নগরী এলিউসিসে। সেখানে একটি কুয়োর পাশে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি। ঠিক তখনই এলিউসিসের রাজা সেলেউসের কন্যারা সেখানে এসে বৃদ্ধাকে দেখতে পান। তার ক্লান্ত চেহারা দেখে তাদের মায়া হলো। তারা বৃদ্ধাকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেল। রানি মেটানেইরা তাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানালেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর তিনি ডেমিটারকে একটি প্রস্তাব দিলেন। তাদের ছোট ছেলে ডেমোফনের দেখাশোনার জন্য একজন বিশ্বস্ত ধাত্রী দরকার ছিল। তিনি জানতে চাইলেন, বৃদ্ধা কি সেই দায়িত্ব নিতে রাজি হবেন?
ডেমিটার প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন। নিজের দুঃখের মাঝেও ধীরে ধীরে তিনি ছোট্ট ডেমোফনের প্রতি স্নেহ অনুভব করতে শুরু করলেন। তিনি ঠিক করলেন, শিশুটিকে এমন এক আশীর্বাদ দেবেন যা কোনো সাধারণ মানুষ কখনো পায়নি। প্রতিদিন সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর তিনি গোপনে এক বিশেষ আচার পালন করতেন। দিনের বেলায় তিনি শিশুটির শরীরে দেবতাদের অমৃত মাখিয়ে দিতেন। আর রাতে তাকে পবিত্র আগুনের মধ্যে রাখতেন, যাতে তার মানবীয় দুর্বলতা ধীরে ধীরে পুড়ে যায়।
এতে শিশুটির কোনো ক্ষতি হতো না, বরং ডেমিটারের উদ্দেশ্য ছিল তাকে অমর করে তোলা। কিন্তু এক রাতে সবকিছু বদলে গেল। হঠাৎ করেই রানি মেটানেইরা সেই ঘরে ঢুকে পড়লেন। নিজের সন্তানকে আগুনের মধ্যে দেখে তিনি ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। তার সেই চিৎকারে ডেমিটার চমকে গেলেন। তিনি দ্রুত ডেমোফনকে আগুন থেকে তুলে নিলেন।
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। অমরত্ব দেওয়ার সেই পবিত্র আচার মাঝপথেই থেমে গেল এবং আর কখনো সম্পূর্ণ করা সম্ভব হলো না। ডেমিটার গভীর হতাশায় নিজের ছদ্মবেশ ত্যাগ করলেন। মুহূর্তের মধ্যে বৃদ্ধা নারীর রূপ মিলিয়ে গেল। পুরো রাজপ্রাসাদ এক অপূর্ব আলোর ঝলকে ভরে উঠল। সবার সামনে আবির্ভূত হলেন তার প্রকৃত রূপ। তার সোনালি চুল সূর্যের আলোর মতো দীপ্তি ছড়াচ্ছিল। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল স্বর্গীয় সুগন্ধ। তার উপস্থিতিতে পুরো প্রাসাদ যেন দেবীয় আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
এ দৃশ্য দেখে রাজা সেলেউস ও রানি মেটানেইরা বিস্ময়ে নতজানু হয়ে পড়লেন। ডেমিটার তাদের জানালেন, তারা অজান্তেই এমন একটি পবিত্র আচার ভেঙে দিয়েছেন, যা সম্পূর্ণ হলে ডেমোফন অমর হয়ে যেত। এরপর তিনি এলিউসিসের মানুষদের শহরের বাইরে তার জন্য একটি বিশাল মন্দির নির্মাণের নির্দেশ দিলেন।
তিনি জানিয়ে দিলেন, পার্সেফোনি ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করবেন। এলিউসিসের মানুষ দেবীর আদেশ অমান্য করার সাহস পেল না। অল্প সময়ের মধ্যেই তার জন্য একটি সুন্দর ও বিশাল মন্দির নির্মাণ করা হলো।
কিন্তু সেই মন্দিরেও ডেমিটারের শোক কমল না। বরং প্রতিদিন তার কষ্ট আরও গভীর হতে লাগল। শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, যার প্রভাব পড়ল পুরো পৃথিবীর ওপর। তিনি পৃথিবীতে আর কোনো ফসল জন্মাতে দিলেন না। বীজ মাটির নিচেই পড়ে রইল। গাছে আর ফল ধরল না। গমের ক্ষেত শুকিয়ে যেতে লাগল। ফুল ফুটল না। সবুজ পৃথিবী ধীরে ধীরে অনুর্বর হয়ে উঠতে শুরু করল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পৃথিবীতে দেখা দিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।মানুষ খাবারের অভাবে কষ্ট পেতে লাগল। দেবতাদের উদ্দেশে উৎসর্গ করার মতো শস্যও আর অবশিষ্ট রইল না।
পৃথিবীর এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে অলিম্পাসের দেবতারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। জিউস একের পর এক দেবতাকে ডেমিটারের কাছে পাঠালেন। তাঁদের কাজ ছিল ডেমিটারকে বোঝানো, যেন তিনি আবার পৃথিবীতে ফসল ফলতে দেন। কিন্তু কেউই তাকে রাজি করাতে পারলেন না। ডেমিটার সবার কাছে একই কথা বললেন। পার্সেফোনি ফিরে না আসা পর্যন্ত পৃথিবীতে আর কোনো গাছপালা জন্মাবে না। দিনের পর দিন দুর্ভিক্ষ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে লাগল। মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়ল। দেবতাদের উদ্দেশে পূজা ও উৎসর্গও প্রায় বন্ধ হয়ে গেল, কারণ মানুষের কাছে আর কোনো শস্য অবশিষ্ট ছিল না।
অবশেষে জিউস বুঝলেন, এভাবে চলতে থাকলে মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, পার্সেফোনিকে অবশ্যই পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে হবে। এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তিনি দিলেন দেবতাদের দ্রুতগামী দূত হার্মিসকে। জিউসের আদেশ নিয়ে হার্মিস পৃথিবীর গভীরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের পথে যাত্রা করলেন। অন্ধকার গুহা, রহস্যময় পথ আর মৃতদের রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে তিনি পৌঁছে গেলেন হেডিসের বিশাল প্রাসাদে। সেখানে তিনি দেখলেন, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সিংহাসনে হেডিসের পাশে বসে আছেন পার্সেফোনি।

প্রথম দিকে এই অন্ধকার রাজ্যে এসে তিনি গভীর শোকে ডুবে ছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে। তিনি মৃতদের জগতের নিয়মকানুন শিখেছেন। বুঝতে শুরু করেছেন এই রাজ্যের রানি হিসেবে তার দায়িত্ব কী।
প্রাচীন গ্রিক কাহিনিগুলোতে পার্সেফোনিকে সারাজীবন অসহায় বন্দি হিসেবে দেখানো হয় না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন শক্তিশালী ও সম্মানিত রানিতে পরিণত হন। হার্মিস জিউসের আদেশ হেডিসকে জানালেন। হেডিস বুঝলেন, আর এই আদেশ অমান্য করার উপায় নেই। তিনি পার্সেফোনিকে পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। তবে বিদায়ের আগে তিনি পার্সেফোনির হাতে একটি পাকা ডালিম তুলে দিলেন।
এখানেই বিভিন্ন কাহিনিতে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়।
কিছু গল্পে বলা হয়েছে, হেডিস জানতেন ডালিমের বীজ খেলে পার্সেফোনিকে আবার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফিরতে হবে। তাই তিনি ইচ্ছা করেই তাকে তা খেতে দিয়েছিলেন।
আবার কিছু কাহিনিতে বলা হয়েছে, পার্সেফোনি না জেনেই কয়েকটি বীজ খেয়ে ফেলেছিলেন।
যাই হোক, পার্সেফোনি ডালিমের কয়েকটি উজ্জ্বল লাল বীজ খেয়ে ফেললেন। পরে তিনি জানতে পারলেন, এই কাজের ফল কত বড় হতে চলেছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের খাবারে ছিল এক প্রাচীন অলৌকিক শক্তি। সেই রাজ্যের কোনো খাবার যে খাবে, তার সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের চিরস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি হবে।
হার্মিস পার্সেফোনিকে নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে এলেন। ডেমিটার দূর থেকেই নিজের মেয়েকে দেখতে পেলেন। তিনি ছুটে গিয়ে পার্সেফোনিকে জড়িয়ে ধরলেন। মা ও মেয়ের সেই পুনর্মিলনের আনন্দে যেন পুরো পৃথিবী প্রাণ ফিরে পেল।
মাটির নিচ থেকে আবার সবুজ ঘাস মাথা তুলল। বিভিন্ন রঙের ফুল ফুটতে শুরু করল। শুকিয়ে যাওয়া গাছে নতুন পাতা গজাল। বনে ফিরে এল পাখিদের কোলাহল। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল বসন্তের উষ্ণতা ও নতুন জীবনের ছোঁয়া। কিন্তু এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
ডেমিটার জানতে পারলেন, পার্সেফোনি আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডালিমের বীজ খেয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে পড়ে গেল সেই প্রাচীন নিয়ম। যে একবার আন্ডারওয়ার্ল্ডের খাবার খাবে, সে আর চিরদিনের জন্য পৃথিবীতে থাকতে পারবে না। এই জটিল সমস্যার সমাধান করতে আবারও এগিয়ে এলেন জিউস। অনেক আলোচনা শেষে একটি সমঝোতা হলো। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, পার্সেফোনি বছরের একটি অংশ হেডিসের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডে থাকবেন। বাকি সময় তিনি পৃথিবীতে মায়ের সঙ্গে কাটাবেন। প্রাচীন গ্রন্থে এই সময়ের হিসাব এক রকম নয়।
কিছু সূত্রে বলা হয়েছে, তিনি বছরের এক-তৃতীয়াংশ আন্ডারওয়ার্ল্ডে থাকতেন।
আবার পরবর্তী অনেক কাহিনিতে বলা হয়েছে, ছয় মাস হেডিসের সঙ্গে এবং ছয় মাস ডেমিটারের সঙ্গে কাটাতেন। সময়ের হিসাব যাই হোক, এই নিয়ম চিরস্থায়ী হয়ে গেল। প্রতি বছর যখন পার্সেফোনি পৃথিবীতে ফিরে আসতেন, ডেমিটারের আনন্দে প্রকৃতি আবার জেগে উঠত। বসন্তের আগমন ঘটত। রঙিন ফুলে ভরে যেত মাঠ ও বন। শস্যক্ষেত সবুজ হয়ে উঠত।
এরপর আসত গ্রীষ্ম, আর চারদিকে দেখা দিত প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধি। আবার যখন পার্সেফোনির আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফিরে যাওয়ার সময় হতো, ডেমিটার শোকে ভেঙে পড়তেন। গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ত। বাতাস ঠান্ডা হয়ে আসত। মাঠের ফসলের বৃদ্ধি থেমে যেত। ধীরে ধীরে নেমে আসত শীত।
এইভাবেই প্রাচীন গ্রিকরা বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীতে ঋতু পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। তাদের মতে, বসন্ত ও গ্রীষ্ম হলো সেই সময়, যখন মা ও মেয়ে একসঙ্গে থাকেন। আর শরৎ ও শীত হলো সেই সময়, যখন পার্সেফোনি আবার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফিরে যান এবং ডেমিটারের শোকের ছায়ায় প্রকৃতি নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। পার্সেফোনি পৃথিবীতে ফিরে আসার পর ডেমিটার ধীরে ধীরে নিজের দুঃখ কাটিয়ে উঠলেন।
এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পার্সেফোনির জীবনও বদলে যেতে থাকে। যে তরুণী একদিন ফুল তুলতে গিয়ে হেডিসের হাতে আন্ডারওয়ার্ল্ডে পৌঁছেছিলেন, তিনিই ধীরে ধীরে সেই রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী শাসকে পরিণত হন। শুরুর দিকে তিনি মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কষ্টে ভুগলেও পরে মৃতদের জগতের নিয়মকানুন, বিচারব্যবস্থা এবং রাজ্যের দায়িত্ব নিজের মতো করে গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে তিনি শুধু হেডিসের স্ত্রী হিসেবেই নয়, আন্ডারওয়ার্ল্ডের রানি হিসেবেও সম্মান অর্জন করেন।
পরবর্তী গ্রিক পুরাণে তাকে একজন জ্ঞানী, শান্ত এবং ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই কারণেই পরবর্তী অনেক বিখ্যাত পুরাণে পার্সেফোনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা যায়।
প্রাচীন গ্রিকদের কাছে ঋতু পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় পার্সেফোনিই মুখ্য ভূমিকা।
তারা বিশ্বাস করতেন, পার্সেফোনি যখন পৃথিবীতে ফিরে আসেন, তখন ডেমিটারের আনন্দে প্রকৃতি নতুন প্রাণ ফিরে পায়। আর যখন তিনি আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফিরে যান, তখন ডেমিটারের শোকে পৃথিবীতে নেমে আসে শরৎ ও শীত। এটি একই সঙ্গে জীবন, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের চিরন্তন চক্রেরও প্রতীক ছিল। পরবর্তী সময়ে অনেক লেখক ও গবেষক এই গল্পকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করেছেন।

হেডিস ও পার্সেফোনির গল্প প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। কারণ এটি শুধু দেবদেবীর গল্প নয়। এটি ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, শোক, পরিবর্তন, দায়িত্ব এবং নতুন করে জীবনকে গ্রহণ করার এক চিরন্তন কাহিনি।
আজও প্রতি বসন্তে প্রকৃতি যখন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়, অনেকেই প্রতীকী অর্থে মনে করেন, পার্সেফোনি আবার পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন। আর শীত যখন নেমে আসে, তখন যেন তিনি আবার আন্ডারওয়ার্ল্ডের পথে যাত্রা করেন।
এভাবেই হাজার হাজার বছর ধরে গ্রিক পুরাণে মা ও মেয়ের পুনর্মিলন এবং বিচ্ছেদের এই গল্প মানুষের কল্পনা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অমর হয়ে আছে।
.png)







