আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার/মোদির প্রতিশ্রুতির পরও অশান্ত রাজপথ, ভারতের ছাত্রবিক্ষোভ কোন পথে?

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই ঘটনা মোদি সরকারের তৃতীয় মেয়াদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
এক বার্তায় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মোদি কথা বলেন। তিনি জানান, জালিয়াতিতে জড়িতদের শাস্তি দিতে সরকার দ্রুত বিচার আদালত গঠন করবে। ভারতজুড়ে তরুণদের এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী নয়াদিল্লি এখন এই বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থল। চলমান এই অস্থিরতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রথমবারের মতো মুখ খুললেন।
একই রাতে ভারতীয় অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক তার ২৬ দিনের অনশন ভাঙেন। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তিনি এই অনশন করছিলেন।
তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না।
নয়াদিল্লির পাশাপাশি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও পাটনার মতো বড় শহরগুলোতেও এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
বিক্ষোভের কারণ কী?
গত মে মাসে অনলাইনে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়। ভারতের প্রধান বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে ব্যঙ্গাত্মক হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও তারাই এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
সিজেপি এখন তরুণদের একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কারও তাদের অন্যতম প্রধান দাবি।
সম্প্রতি প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও পরীক্ষা বাতিলের মতো বেশ কিছু কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) এসব ব্যর্থতায় জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন।
বিক্ষোভের মূল কেন্দ্র এখন নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর। এটি পার্লামেন্ট স্ট্রিটের কাছাকাছি অবস্থিত ১৮ শতকের একটি ঐতিহাসিক মানমন্দির। সাধারণত এখানে গণতান্ত্রিক বিক্ষোভগুলো হয়ে থাকে।
গত সোমবার থেকে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট স্ট্রিটের একাংশ দখল করে রেখেছেন। পার্লামেন্ট হাউস থেকে ভারতের রাজধানীর প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র কনট প্লেস পর্যন্ত সংযোগকারী প্রধান সড়কেও হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাঁবু গেড়ে অবস্থান নিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহে যন্তর মন্তর এলাকায় বেশ কয়েকবার সহিংস ঘটনা ঘটেছে। গত সোমবার বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল করার চেষ্টা করেন। তখন পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিপেটা করে। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
যন্তর মন্তরে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় ভারত সরকারের কড়া নিন্দা জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
সিজেপির দাবিগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ চায়। শান্তিকামী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। এ ছাড়া সম্প্রতি পরীক্ষা বাতিলের পর যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, তাদের প্রতিটি পরিবারকে এক কোটি রুপি (প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার ডলার) করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সরকারি হিসাব মতেই, এ পর্যন্ত ২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী হতাশায় আত্মহত্যা করেছেন।
সোনম ওয়াংচুকের অনশন প্রত্যাহার
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ২৬ দিন ধরে অনশন করছিলেন প্রখ্যাত জলবায়ু ও অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি অনশন শেষ করেন।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ৫৯ বছর বয়সি ওয়াংচুক অনশন ভাঙার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি লেখেন, ‘বিভিন্ন শর্ত নিয়ে সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। দেশে সম্ভাব্য সহিংসতার কথাও আমাদের মাথায় রাখতে হচ্ছে। তাই আমি অনশন ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং জুনিয়র পারমাণবিক শক্তিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে অনশন ভাঙেন ওয়াংচুক। তারা দুজন ওয়াংচুককে এক গ্লাস পানি খাইয়ে অনশন ভাঙান।
মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অফিশিয়াল সামাজিক মাধ্যমের পেজে পরে জে পি নাড্ডার একটি বক্তব্য প্রকাশ করা হয়। সেখানে নাড্ডা বলেন, ‘দিল্লির যন্তর মন্তরে যারা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছেন এবং যারা গত ২০ জুলাই পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের কারও বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা করবে না। সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
নাড্ডা আরও বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ এবং পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার নিয়ে পার্লামেন্টে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সরকার এই আশ্বাস দিয়েছে। এর পাশাপাশি, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সম্প্রতি যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, তাদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’
মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষা হলো ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা নিট। প্রতিবছর ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু চলতি বছরসহ গত পাঁচ বছরে অন্তত তিনবার এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ মিলেছে।
মোদি ও অন্যান্য নেতারা কী বলেছেন?
ওয়াংচুক অনশন ভাঙার কয়েক ঘণ্টা পর সরকারের দুজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এবং সিজেপির দুজন নেতা আলোচনায় বসেন।
এই বৈঠকের পর চলমান সংকট সমাধানের একটি ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সরকারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে লাখ লাখ ক্ষুব্ধ তরুণ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে নরেন্দ্র মোদি লেখেন, ‘আমাদের দেশের তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না!’
মোদি তার পোস্টে আরও লেখেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যারা আমাদের তরুণদের ভবিষ্যতের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে, তাদের কাউকেই সরকার ছাড় দেবে না।’
শিক্ষার্থীরা কী বলছেন?
বিক্ষোভ দমাতে প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) একটি জরুরি ঘোষণা দেয়। তারা জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নয়াদিল্লির অন্তত ১৬টি মেট্রো স্টেশন পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
এর জবাবে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অভিজিৎ দিপকে এক্সে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি লেখেন, ‘পুরো দিল্লি শহর বন্ধ করে দিতে রাজি আছেন মোদি, কিন্তু ব্যর্থ ধর্মেন্দ্র প্রধানকে তিনি বরখাস্ত করতে রাজি নন।’
শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণের দাবিতে শুক্রবার এক্সে একাধিক পোস্ট করেন দিপকে। তিনি তার অবস্থানে অনড় রয়েছেন।
অন্যদিকে, সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা প্রধানমন্ত্রী মোদির বিচারিক প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি একে কাঠামোগত ব্যর্থতা মোকাবিলার জন্য একেবারেই ‘অপ্রতুল’ বলে উল্লেখ করেছেন।
যন্তর মন্তরে সাংবাদিকদের দেওয়া এক বিবৃতিতে রাঙ্কা বলেন, ‘ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠনের ঘোষণা কোনো প্রকৃত সমাধান হতে পারে না। এটি কেবলই মানুষের মনোযোগ সরানোর একটি রাজনৈতিক কৌশল।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভারতে ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট ছিল না বলে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের চরম অযোগ্যতা ও দুর্নীতির কারণে এসব হচ্ছে। তার পদত্যাগ ছাড়া কোনো আপস হবে না।’
সামনে কী হতে যাচ্ছে?
শুক্রবার সকালে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিজেপির নেতাদের আরও এক দফা বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে সিজেপির নেতারা সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবির ঝুঁকি নিয়ে কেন অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধ শুরু করলেন ট্রাম্প?তারা জানান, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবির বিষয়ে চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার জন্য শনিবার বিকেল পর্যন্ত সময় চেয়েছে সরকার। সরকার যদি এই সময়ের মধ্যে মন্ত্রীকে বরখাস্ত না করে, তবে আন্দোলন দেশজুড়ে আরও কঠোর করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
গত বৃহস্পতিবার ভারত সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সরকার সব সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য উন্মুক্ত। এতে যত সময় লাগুক না কেন, সরকার আলোচনা চালিয়ে যাবে।
তিনি আরও জানান, সরকার এ ক্ষেত্রে নিজেদের ‘সম্মানের অহংকার’ (ইগো) ধরে বসে থাকবে না। দেশ ও তরুণদের স্বার্থে সরকার যেকোনো নমনীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রস্তুত রয়েছে।
.png)








