বিশ্বকাপ ফাইনালে যেসব রেকর্ডের হাতছানি

একটি ম্যাচ, একটি ট্রফি। কিন্তু আর্জেন্টিনা ও স্পেনের বিশ্বকাপ ফাইনাল বদলে দিতে পারে রেকর্ড বইয়ের বেশ কয়েকটি পাতা। টানা শিরোপা জয়ের ইতিহাসের সামনে আর্জেন্টিনা, অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড হাতছানি দিচ্ছে স্পেনকে। লিওনেল মেসি, লিওনেল স্কালোনি, লুইস দে লা ফুয়েন্তে ও লামিন ইয়ামালের সামনেও ব্যক্তিগত কীর্তির দীর্ঘ তালিকা।
এশিয়া পোস্টের পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো সেই রেকর্ডগুলোর কথা:
ফাইনাল জিতলে বিশ্বকাপ ধরে রাখা তৃতীয় দেশ হবে আর্জেন্টিনা। এর আগে কেবল ইতালি ও ব্রাজিল টানা দুই আসরে চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছে।

ইতালি জিতেছিল ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে। ব্রাজিল শিরোপা ধরে রেখেছিল ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে। অর্থাৎ আর্জেন্টিনা সফল হলে ৬৪ বছর পর কোনো দল টানা দুটি বিশ্বকাপ জিতবে।
একই সঙ্গে চতুর্থবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে আলবিসেলেস্তেরা। তখন চারটি করে শিরোপা নিয়ে ইতালি ও জার্মানির পাশে বসবে তারা। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলই শুধু থাকবে সামনে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুবার শিরোপা জেতা একমাত্র কোচ ইতালির ভিত্তোরিও পোজ্জো। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে তার অধীনেই বিশ্বকাপ জিতেছিল ইতালি।

স্পেনকে হারাতে পারলে দ্বিতীয় কোচ হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ জিতবেন স্কালোনি। একই কোচের অধীনে টানা দুই আসরে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঘটনাও ঘটবে ৮৮ বছর পর। ব্রাজিল ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে শিরোপা ধরে রাখলেও দুই আসরে তাদের কোচ ছিলেন আলাদা।
বিশ্বকাপের ট্রফি দুবার তুলে ধরা প্রথম অধিনায়ক হওয়ার সুযোগ মেসির সামনে। ইতালি ও ব্রাজিল টানা বিশ্বকাপ জিতলেও দুটি আসরে তাদের অধিনায়ক ছিলেন আলাদা।

মেসি এরই মধ্যে অধিনায়ক হিসেবে দলকে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলেছেন। ২০১৪ সালে জার্মানির কাছে হারের পর ২০২২ সালে ফ্রান্সকে হারিয়ে পেয়েছিলেন আরাধ্য ট্রফি। এবার জিতলে অধিনায়কত্বের ইতিহাসে একক উচ্চতায় উঠবেন তিনি।
ফাইনালে মাঠে নামলে কাফুর পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার কীর্তিও গড়বেন মেসি। একাদশে থাকলে তিনটি ফাইনাল শুরু করা প্রথম খেলোয়াড় হবেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
ফাইনালের দিন মেসির বয়স হবে ৩৯ বছর ২৫ দিন। মাঠে নামলেই বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা সবচেয়ে বেশি বয়সি আউটফিল্ড খেলোয়াড় হবেন তিনি। ভেঙে দেবেন ১৯৫৮ সালের ফাইনাল খেলা সুইডেনের গুনার গ্রেনের ৩৭ বছর ২৪১ দিনের রেকর্ড।

সব অবস্থান মিলিয়ে মেসির সামনে থাকবেন শুধু ইতালির গোলকিপার দিনো জফ। ১৯৮২ সালের ফাইনাল খেলার সময় তাঁর বয়স ছিল ৪০ বছর ১৩৩ দিন।
এটি হবে মেসির ৩৪তম বিশ্বকাপ ম্যাচ। নিজের দখলে থাকা সর্বাধিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডটিকে আরও বড় করবেন তিনি।
স্পেনের বিপক্ষে গোল করতে পারলে বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে বেশি বয়সি গোলদাতা হবেন মেসি। রেকর্ডটি এখন সুইডেনের নিলস লিডহোমের। ১৯৫৮ সালের ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে গোল করার সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৫ বছর ২৬৪ দিন।
মেসি এরই মধ্যে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের মালিক। ফাইনালে গোল কিংবা অ্যাসিস্ট পেলে নিজের রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ হবে।
এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সাত ম্যাচের সব কটিই জিতেছে আর্জেন্টিনা। ফাইনাল নির্ধারিত বা অতিরিক্ত সময়ে জিতলে বিশ্বকাপের এক আসরে আটটি আনুষ্ঠানিক জয় পাওয়া প্রথম দল হবে তারা।
বিশ্বকাপ ৪৮ দলের হওয়ায় এবারই প্রথম কোনো দল আটটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাচ্ছে। ফাইনাল টাইব্রেকারে জিতলে অবশ্য পরিসংখ্যানে ম্যাচটি ড্র হিসেবে গণ্য হবে। সে ক্ষেত্রে আট জয়ের রেকর্ডটি হবে না।
স্পেন টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ফাইনালে উঠেছে। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইতালির ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড এখন তারা ছুঁয়ে আছে।

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নির্ধারিত বা অতিরিক্ত সময় শেষে হার এড়াতে পারলেই টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত থেকে এককভাবে রেকর্ডের মালিক হবে স্পেন। টাইব্রেকারে হারলেও আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে ম্যাচটি ড্র হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তাদের অপরাজিত যাত্রা অক্ষুণ্ন থাকবে। ২০২৪ সালের মার্চে কলম্বিয়ার কাছে হারের পর আর কোনো ম্যাচ হারেনি লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ
সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল খেয়েছে স্পেন। উনাই সিমন ক্লিন শিট রেখেছেন ছয় ম্যাচে, যা বিশ্বকাপের এক আসরে কোনো গোলকিপারের সর্বোচ্চ।

ফাইনালেও গোল না খেলে সংখ্যাটি সাত হবে। স্পেন চ্যাম্পিয়নও হলে মাত্র একটি গোল হজম করে বিশ্বকাপ জয়ের নতুন রেকর্ড গড়বে। এখন পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন দলের সবচেয়ে কম গোল হজমের রেকর্ড দুইটি। ফ্রান্স ১৯৯৮, ইতালি ২০০৬ এবং স্পেন ২০১০ সালে দুই গোল করে হজম করেছিল। পরিসংখ্যান: দ্য স্ট্যাটস জোন
স্পেন চ্যাম্পিয়ন হলে সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ জেতা কোচ হবেন দে লা ফুয়েন্তে। ফাইনালের দিন তার বয়স হবে ৬৫ বছর ২৮ দিন।

বর্তমান রেকর্ডটিও একজন স্প্যানিশ কোচের। ২০১০ সালে ৫৯ বছর ২০০ দিন বয়সে স্পেনকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন ভিসেন্তে দেল বস্কে।
ফাইনালের দিন ইয়ামালের বয়স হবে ১৯ বছর ৬ দিন। মাঠে নামলে পেলে ও জিউসেপ্পে বের্গোমির পর বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হবেন তিনি। পেছনে ফেলবেন ২০১৮ সালের ফাইনাল খেলা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে।
গোল করতে পারলে পেলের পর দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ ফাইনাল গোলদাতা হবেন ইয়ামাল। সে ক্ষেত্রেও ভাঙবে এমবাপ্পের রেকর্ড।
ইয়ামাল ও পাউ কুবারসি দুজনই কিশোর বয়সে সাতটি করে বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে এমবাপ্পের রেকর্ড ছুঁয়েছেন। ফাইনালে খেললে আট ম্যাচ নিয়ে যৌথভাবে নতুন রেকর্ড গড়বেন স্পেনের দুই তরুণ।
মেসি ও ইয়ামাল দুজনই একাদশে থাকলে বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রতিপক্ষ দলের দুই খেলোয়াড়ের বয়সের ব্যবধানেও রেকর্ড হবে। দুজনের মধ্যে পার্থক্য ২০ বছর ১৯ দিন। ফাইনালের দুই দলের শুরুর একাদশে থাকা খেলোয়াড়দের মধ্যে এর আগে কখনো ২০ বছরের বেশি ব্যবধান দেখা যায়নি।

আরও একটি ব্যক্তিগত রেকর্ডের সামনে মিকেল ওইয়ারসাবাল। পাঁচ গোল করে বিশ্বকাপের এক আসরে স্পেনের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে এমিলিও বুত্রাগেনিও ও দাভিদ ভিয়ার পাশে আছেন তিনি। ফাইনালে আরেকটি গোল করলেই রেকর্ডটি একার হবে তার।
একদিকে অভিজ্ঞতার শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে মেসি, অন্যদিকে কৈশোর পেরোনো ইয়ামাল। মাঝখানে টানা শিরোপার স্বপ্ন দেখা আর্জেন্টিনা এবং প্রায় অভেদ্য স্পেন। তাই এই ফাইনালে শুধু নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়নই পাওয়া যাবে না, জন্ম নিতে পারে একগুচ্ছ নতুন ইতিহাসও।
.png)







