আমেরিকা বনাম আর্জেন্টিনা, গরুর মাংসের স্টেক কার সেরা

বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে আমেরিকার টেক্সাসে এখন হাজার হাজার আর্জেন্টিনা ভক্তের ঢল নেমেছে। কারণ রোববার (২৮ জুন) আর্জেন্টিনা বনাম জর্ডানের খেলার ভেন্যু টেক্সাসে। তবে সেখানে মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে এক ভিন্ন রকম বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। আলোচনা কিন্তু কার দল সেরা বা লিওনেল মেসি সেরা খেলোয়াড় কিনা তা নিয়ে নয়; বরং বিতর্ক জমে উঠেছে অন্য এক লড়াইয়ে। আমেরিকা বনাম আর্জেন্টিনা—কার গরুর মাংসের স্টেক সবচেয়ে সেরা এবং তা কীভাবে প্রস্তুত করা হয়, তা নিয়েই চলছে এই শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতা।
গবাদি পশু পালন এবং গরুর মাংস উৎপাদনে শীর্ষ দুই দেশের মানুষের খাদ্যতালিকা ও সংস্কৃতির সঙ্গে স্টেক গভীরভাবে মিশে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকায় গরুর মাংস উৎপাদনে টেক্সাস প্রথম স্থানে রয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী ব্রাজিলের পরে রয়েছে আমেরিকার অবস্থান। অন্যদিকে, এই তালিকায় আর্জেন্টিনা রয়েছে ষষ্ঠ অবস্থানে। ফলে মাংসপ্রেমীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—আসলে কারা সবচেয়ে ভালো স্টেক তৈরি করে?
আর্জেন্টাইনদের গরুর মাংসের পক্ষে যুক্তি
১৯৯৮ সাল থেকে টেক্সাসে বসবাসকারী ৬৪ বছর বয়সি আর্জেন্টিার প্রশিক্ষিত রাঁধুনি কার্লোস এদুয়ার্দো বারাহোনা তার দেশের মাংসের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন।
আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও টেক্সাসের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টাইন গরুর মাংসের কোনো তুলনা হয় না। এর সুস্বাদু টেক্সচার এবং কাটার স্টাইলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কেউ নেই।’
বারাহোনা বলেন, ‘আমাদের দেশের সবচেয়ে সস্তা মাংস দিয়েও একটি ঐতিহ্যবাহী আসাদো (আর্জেন্টিনার নিজস্ব ঐতিহ্যের বারবিকিউ) তৈরি করে দারুণ উপভোগ করা যায়। আর এখানে টেন্ডারলইনের মতো সেরা মাংস ব্যবহার করলেও, তা কোথা থেকে এসেছে তার ওপর ভিত্তি করে শক্ত, খাওয়ার অযোগ্য বা নরম হতে পারে। তবে আমাদের গরুর মাংসের স্বাদের ধরণ সম্পূর্ণ আলাদা।’
আর্জেন্টিনার গবাদি পশু মূলত উন্মুক্ত চারণভূমিতে ঘাস খেয়ে বড় হয়, যার ফলে এগুলো বাজারে বিক্রির উপযোগী হতে বেশি সময় নেয়। এর ফলাফল হলো চর্বিহীন মাংস এবং প্রাকৃতিক ও মাটির সোঁদা গন্ধের স্বাদ।
টেক্সাসের গরুর মাংসের পক্ষে যুক্তি
আমেরিকার বিশেষ করে টেক্সাসের গরুর মাংসের রয়েছে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য। এখানকার গবাদি পশুকে মূলত শস্য বা দানাশস্য খাওয়ানো হয়। এর ফলে মাংসে মার্বলিং বা পেশির ভেতরে চর্বির রেখা বেশি থাকে, যা রান্নার সময় মাংসকে ভেতর থেকে নরম, অনেক বেশি রসালো ও মিষ্টি স্বাদের করে তোলে।
টেক্সাসের কৃষি কমিশনার সিড মিলার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের গরুর মাংস, বিশেষ করে টেক্সাসের গরুর মাংসের চেয়ে সেরা কোনো মাংস নেই।’

তবে মিলার বলেন, ‘আর্জেন্টিনার গরুর মাংসও বেশ ভালো। আর সেটি টেক্সাসের কারণেই হয়েছে।’
মিলার জানান, এক দশকেরও বেশি সময় আগে তার সংস্থা টেক্সাসের গবাদি পশু পালনকারীদের সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকার, বিশেষ করে আর্জেন্টিনার খামারিদের যোগাযোগ করিয়ে দিতে একটি বিপণন অফিস খোলে।
তিনি বলেন, ‘আমি আর্জেন্টিনার বন্ধুদের ছোট করতে চাই না, তবে আমরা তাদের মান উন্নত করতে সাহায্য করেছি।’
মিলার আরও বলেন, ‘তাদের গরুর জিনগত বৈশিষ্ট্যে ঘাটতি ছিল। আমরা সেগুলোকে বেশ উচ্চ মানের পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। আমরা তাদের কাছে প্রচুর পরিমাণ সিমেন (বীজ), ভ্রূণ এবং প্রজনন উপযোগী গবাদি পশু বিক্রি করেছি।’
মিলার গরুর গুণগত মান উন্নত করার জন্য আর্জেন্টিনার খামারিদের অভিনন্দন জানান। বলেন, ‘আর্জেন্টিনার গবাদি পশুর পালে এখন আমেরিকান জিন রয়েছে, তাই সেগুলো তো ভালো হতেই হবে!’
আসল রহস্য লুকিয়ে রন্ধনশৈলীতে
ফুটবল ভক্ত ও সাধারণ ভোক্তারা অবশ্য এই বিতর্ককে খুব একটা জটিল করে দেখছেন না।
অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে জয়ের ম্যাচে মেসির দুটি গোল দেখার পর টেক্সাসের আর্লিংটনের একটি ওয়ালমার্ট সুপারশপে মাংস কিনছিলেন আর্জেন্টিনার ভক্ত গনজালো হেরেরা। কার মাংস ভালো—এমন প্রশ্নে তিনি শুধু কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিজের শপিং কার্টে চারটি টি-বোন স্টেক তুললেন। ৪৫ ডলার দামের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে তিনি বললেন, ‘সত্যি বলতে, আমি খুব বড় কোনো পার্থক্য দেখি না। আসল বিষয় হলো কোন অংশটি কিনতে হবে তা সঠিকভাবে জানা এবং আমাদের দেশের সমমানের মাংস খুঁজে নেওয়া। তবে এখানকার দাম অনেক বেশি।’
গরুর মাংসের এই খুনসুটি আসলে শুধু মাংসের ওপর নয়, বরং রেসিপি, রান্নার ধরণ এবং মাংসের টুকরো কতটা পুরু হবে তার ওপরও নির্ভর করে। ডালাসের ‘কোরিয়েন্তেস ৩৪৮ আর্জেন্টাইন স্টেক হাউস’-এর সহকারী ব্যবস্থাপক ইমানুয়েল তোবোন জানান, টেক্সাসের মানুষ স্টেকে প্রচুর গোলমরিচ, মাখন এবং বার্বিকিউ সস ব্যবহার করে।

অন্যদিকে, আর্জেন্টাইনরা বংশানুক্রমিক ঐতিহ্য মেনে স্টেকের আসল স্বাদ ফুটিয়ে তুলতে কেবল লবণ আর মেসকুইট কাঠকয়লার আগুন ব্যবহার করে।
ডালাসে আর্জেন্টিনার অন্তত আরও একটি ম্যাচ বাকি রয়েছে। আলবিসেলেস্তে সমর্থকরা বিশ্বকাপের সময় ঘরের স্বাদের খোঁজে এই রেস্তোরাঁটিতে নিয়মিত ভিড় জমাচ্ছেন। তোবোন বলেন, ‘তারা টেক্সাসের সংস্কৃতি উপভোগ করছে। তবে তাদের সবাইকে এখানে স্বাগত জানানো এবং তাদের ঘরের মতো অনুভূতি দেওয়াটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।’
তিনি জানান, আর্জেন্টাইনরা তাদের স্টেক সংস্কৃতি, বংশানুক্রমিকভাবে চলে আসা রেসিপি এবং বড় পারিবারিক খাবারে গ্রিল মাস্টারের ‘পবিত্র’ দায়িত্ব নিয়ে ভীষণ গর্ব বোধ করে।
বুয়েনস আইরেসের বাসিন্দা ফার্নান্দো গার্সিয়া মরিল্লো, যিনি এখন মায়ামির কাছে থাকেন, তার মতে দুই দেশের মাংসই চমৎকার। তবে যুক্তরাষ্ট্রে স্টেক অর্ডার করার সময় তিনি দেশের ঐতিহ্যগুলো মিস করেন। মরিল্লো বলেন, ‘আমি কেবল লবণ দিয়ে তৈরি স্টেক অর্ডার করি, কোনো গোলমরিচ বা অন্য কিছু ছাড়া, একদম সাধারণ। এখানে মাঝে মাঝে তারা প্রচুর সস ব্যবহার করে।’
আমেরিকা ও আর্জেন্টিনার মধ্যে মাংস নিয়ে কোনো বড় ধরনের শত্রুতার কথা উড়িয়ে দিয়ে তিনি হেসে বলেন, ‘হয়তো আমাদের প্রতিবেশী ব্রাজিলের সঙ্গে বরাবরের মতো একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। তবে আমেরিকান মাংস আমার বেশ পছন্দ।’
সূত্র:এপি







