৯৫ ভুয়া বিসিএস ক্যাডারের কে কোথায়

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে চিহ্নিত হওয়ার পরও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দপ্তরে বহাল রয়েছেন ৯৫ ভুয়া বিসিএস ক্যাডার। চাকরির শর্ত পূরণ না করেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ ছাড়াই বিসিএস ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ পান তারা। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ‘পিএসসির সুপারিশ ছাড়াই নিয়োগ, ৯৫ ভুয়া বিসিএস ক্যাডারের সন্ধান’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে এশিয়া পোস্ট।
বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন শুরু হয়। তবে অভিযুক্ত ভুয়া বিসিএস ক্যাডারদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের মধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে জালিয়াতি করে চাকরি পাওয়ার অভিযোগে দুদক মামলা করার পরও চাকরিতে বহাল রয়েছেন। উল্টো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই ভুয়া ক্যাডারদের মধ্যে অনেককে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনেরও সুযোগ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
কে কোথায়
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ভুয়া বিসিএস ক্যাডাররা নিজেদের অনেকটা আড়ালে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিগত সরকারের সময়ে প্রশাসন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে নিজেদের জাহির করতেন; গেল দেড় বছরে সে প্রবণতা থেকেও বিরত থাকছেন তারা। এরপরও ৯৫ ভুয়া বিসিএস ক্যাডারের মধ্যে কে কোথায় কর্মরত তা জানার চেষ্টা করেছে এশিয়া পোস্ট। তালিকা ধরে খোঁজ নিয়ে প্রাথমিকভাবে ১২ জনের বর্তমান কর্মস্থলের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকিদের বিষয়ে এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
প্রভাবশালী মমতাজ এখন কুষ্টিয়ায়
২৯ বিসিএসের অন্যতম প্রভাবশালী ক্যাডার হিসেবে পরিচিত মমতাজ বেগম এখন ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব। কর্মরত আছেন কুষ্টিয়ার জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে। এর আগে তিনি ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার, সিনিয়র সহকারী কমিশনার এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ঢাকার মতিঝিল ও ক্যান্টনমেন্ট সার্কেলের সহকারী কমিশনার—ভূমি (এসিল্যান্ড), নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবেও কাজ করেছেন। শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জের মেয়ে মমতাজ আওয়ামী লীগের আমলে নিজেকে সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং নিজের অফিসকক্ষে শেখ হাসিনার সঙ্গে তোলা ছবি টানিয়ে রাখতেন। ইউএনও থাকাকালীন সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ১ হাজার ২০০ ছবি নিয়ে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে শুরু করে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকাজুড়ে গ্যালারি স্থাপন করেছিলেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র থেকে পরিকল্পনায় নাসরীন
২৯ বিসিএসের আরেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা উপসচিব নাসরীন পারভীন।
দুদক চিহ্নিত এই ভুয়া ক্যাডার পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগে উপ-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তারও আগে কাজ করেছেন গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবং মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া ও টাঙ্গাইলের ভূয়াপুরের ইউএনও হিসেবে। পুরো চাকরিজীবনে তিনি ঢাকা এবং আশপাশের স্টেশনগুলোতেই পোস্টিং নিয়েছেন।
সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী নাহিদা বারিক আছেন বনশিল্পে
২৯তম বিসিএসের আরেক ভুয়া ক্যাডার নাহিদা বারিক
সবসময় নিজেকে সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নারায়ণগঞ্জের বন্দর ও ফতুল্লায় এসিল্যান্ড, সদর উপজেলার ইউএনও, কৃষি সচিবের পিএস এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে কাজ করেছেন তিনি। বর্তমানে উপসচিব পদমর্যাদায় আছেন বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের সচিব পদে। ইউএনও থাকাকালীন বিরোধী দলের সরকারবিরোধী আন্দোলন দমাতে হেলমেট মাথায় দিয়ে পুলিশ-র্যাবের সঙ্গে মাঠে নেমে আলোড়ন তুলেছিলেন নাহিদা। বিসিএস নিয়োগে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।
পিএসসিতেও কাজ করেছেন আসমাউল
পিএসসির সুপারিশ ছাড়া নিয়োগ পাওয়ায় যাকে ভুয়া ক্যাডার হিসেবে চিহ্নিত করেছে দুদক, সেই আসমাউল হুসনা লিজা
তার চাকরিজীবনে পিএসসির উপপরিচালক পদেও কাজ করেছেন। ২৯ বিসিএসের এই ভুয়া ক্যাডার বর্তমানে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পরিচালক (উপসচিব পদমর্যাদা)। এর আগে তিনি মানিকগঞ্জের ঘিওর, গাজীপুরের কাপাসিয়া এবং গাজীপুর সদরের এসিল্যান্ড ছিলেন। পরে মানিকগঞ্জ সদর ও টাঙ্গাইলের সখীপুরের ইউএনও এবং শরীয়তপুরের এডিসি হিসেবে চাকরি করেছেন।
সালমান এফ রহমানের পিএস তোফাজ্জলও বহাল তবিয়তে
২৯তম বিসিএসে নিয়োগের শর্ত পূরণ করতে না পারলেও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে চাকরি পাওয়া তোফাজ্জল হোসেন
বর্তমানে জামালপুরের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার (উপসচিব পদমর্যাদা)। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি সালমান এফ রহমানের পিএস ছিলেন তিনি। সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের পিএস হিসেবেও কাজ করেছেন। এর আগে ঢাকার মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেল ও রমনা সার্কেলের এসিল্যান্ড ছিলেন। পরে ঢাকার নবাবগঞ্জের ইউএনও এবং নারায়ণগঞ্জের এডিসি পদেও কাজ করেছেন। বিসিএসে জালিয়াতি করে নিয়োগে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।
দুদকের মামলার পরও কর্মরত হালিমা ও মিল্টন
জালিয়াতি করে ২৯ বিসিএসে নিয়োগ পাওয়া হালিমা খাতুনের
বিরুদ্ধে এরই মধ্যে মামলা করেছে দুদক। এরপরও বহাল তবিয়তে আছেন পরিবার পরিকল্পনায় নিয়োগ পাওয়া এই ভুয়া বিসিএস ক্যাডার। বর্তমানে তিনি চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের সহকারী পরিচালক।
দুদকের মামলার আরেক আসামি মো. মিল্টন আলী বিশ্বাস। ২৯ বিসিএসে জালিয়াতি করে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া এই কর্মকর্তা এখন ঝিনাইদহের সরকারি কেশব চন্দ্র কলেজের সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)।
৩০ বিসিএসের দুজন দুই মন্ত্রণালয়ে
৩০ বিসিএসের ভুয়া ক্যাডারদের মধ্যে রয়েছেন রুবায়েত ফেরদৌসী এবং পারভীন সুলতানা। তাদের মধ্যে রুবায়েত এখন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব। পুরো চাকরিকাল তিনি কাটিয়েছেন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে।
পারভীন সুলতানা সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে আছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। চার বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ এ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এর আগে ঢাকা-মানিকগঞ্জে চাকরির পর খুলনায় এসিল্যান্ড ও ইউএনও হিসেবে কাজ করেছেন।
সালাউদ্দিন মনজু এখন চুয়াডাঙ্গায়
৩১তম বিসিএসে ভুয়া ক্যাডার হিসেবে চিহ্নিত এইচএম সালাউদ্দিন মনজু
বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ছাত্রজীবনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ক্যাডার হিসেবে কুখ্যাত ছিলেন তিনি। চাকরিজীবনে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বাইরে মন্ত্রণালয়ে পদায়ন ছিল তার। তিনি আমিনবাজারের এসিল্যান্ড, সালমান এফ রহমানের নির্বাচনি এলাকা দোহারের ইউএনও এবং নারায়ণগঞ্জের সড়ক-মহাসড়ক বিভাগের এডিসি ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (এডিসি) দায়িত্বে থাকাকালে ৪২ লাখ টাকা উদ্ধার ও সার্ভেয়ার গ্রেপ্তারের ঘটনায় মনজুকে ওএসডি করা হয়েছিল।
তানভীর ও সাইকা আছেন পরিকল্পনা কমিশনে
এসএম সাদিক তানভীর ৩১ বিসিএসের আরেক ভুয়া ক্যাডার হিসেবে চিহ্নিত।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবের পিএস, গাজীপুর সদরের ইউএনও এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ারের পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এখন আছেন পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ন উইং-২ এর সিনিয়র সহকারী প্রধান হিসেবে।
এ বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে এশিয়া পোস্টকে সাদিক তানভীর বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে বিসিএসে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা। পিএসসির সুপারিশ মোতাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে চাকরি পেয়েছেন দাবি করে তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে আপনি পিএসসি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে করবেন।
৯৫ ভুয়া ক্যাডারের তালিকায় নাম রয়েছে ৩১ বিসিএসের সাঈকা সাহাদাত।
বর্তমানে তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সিনিয়র সহাকারী প্রধান। এর আগে তিনি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার এসিল্যান্ড, কক্সবাজারের পেকুয়ার ইউএনও ও ঢাকার বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে কাজ করেছেন। পেকুয়ায় ইউএনও থাকাকালে চাল কেলেঙ্কারির ঘটনায় আলোচনায় আসেন তিনি।
বক্তব্য দিতে নারাজ জনপ্রশাসন সচিব
দুদকের অনুসন্ধানে চিহ্নিত ৯৫ ভুয়া ক্যাডার চিহ্নিত হওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে কেন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার? এ বিষয়ে জানতে বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের সঙ্গে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি তিনি।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
নিয়ম ভেঙে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের বিষয়টিকে জাতীয় চরিত্র অবক্ষয়ের নির্লজ্জ উদাহরণ বলে আখ্যায়িত করেন সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার। ইতোপূর্বে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, এটাতে ছাড় দেওয়া বা নমনীয়ভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, যারা বিচার করে, মোবাইল কোর্ট করে, সরকারের প্রতিনিধিত্ব করে তারাই যদি এমন প্রতারণা করে তাহলে তাদের কাছ থেকে কী ভালো কাজ আশা করা যায়। তাদের শাস্তি নিশ্চিত হলে পরে এমন কাজের পুনরাবৃত্তি করতে আর কেউ সাহস পাবে না।
পিএসসির সুপারিশ ছাড়াই নিয়োগের এ প্রক্রিয়া নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মূল অভিযোগটা অবশ্যই প্রতারণামূলক। কোনো দিক থেকে যারা যোগ্য নয় এমন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার। এভাবে সরকারি খাতে নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। এ অবৈধ ও প্রতারণামূলক নিয়োগে জড়িতদের মধ্যে নিয়োগ কর্তৃপক্ষ এবং যারা সুবিধা নিয়েছে উভয়কেই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসির সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ৯৫ ভুয়া বিসিএস ক্যাডার শনাক্তের বিষয়ে দুদক থেকে অফিসিয়ালি কোনো তথ্য এখনও আমাদের কাছে আসেনি। যদি এমন কিছু হয়ে থাকে এবং কারও বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তে এমন তথ্য প্রমাণিত হয়, তবে সেই পরীক্ষার্থী ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি-বিধান অনুযায়ী অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




