মূল কাজ শুরুর আগেই জুলাই প্রকল্প সংশোধন

দেশ-বিদেশ থেকে অডিও ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এজন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি প্রকল্পও নেওয়া হয়েছিল। গত বছর অনুমোদন পাওয়া ওই প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হওয়ার আগেই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। শুধু নাম নয়, প্রকল্পের কাজের পরিধিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে নাম ও পরিধি পরিবর্তন করে প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের বাস্তবায়নাধীন ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-২০২৪’ সংরক্ষণ প্রকল্পের মূল নাম ছিল ‘দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-২০২৪ এর অডিও ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ’। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পের নাম হবে ‘মহান স্বাধীনতা যুদ্ধসহ বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহ, ডকু-ড্রামা তৈরি এবং গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে তথ্যচিত্র নির্মাণ’।
বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) চতুর্থ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ৮ জুন অনুষ্ঠিত ওই সভায় জানানো হয়, প্রকল্পের বর্তমান নাম পরিবর্তন করে প্রস্তাবিত নতুন নাম রাখা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এবং দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ইতিহাসকে একসূত্রে গাঁথার লক্ষ্যে এই সংশোধনী আনা হয়েছে। গত ৩ জুন সংশোধিত আরডিপিপি প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, গত ২ জুন সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পের নাম পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পের নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে আরডিপিপি পুনরায় সংশোধন ও পুনর্গঠন করে শিগগিরই প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ডিপিপি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কারণে প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হিসেবে অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহ, ফুটেজ সংগ্রহ ও ডকুমেন্টারি নির্মাণ কার্যক্রম এখনও শুরু করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে এটি শুধুমাত্র ‘ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-২০২৪’ কেন্দ্রিক থাকলেও এখন এতে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন যুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় এখন কেবল ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান নয়, বরং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধসহ এ যাবৎকালের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসকে অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিলের মাধ্যমে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী এই প্রকল্পের আওতায় ফিল্ম নির্মাণের সংখ্যাও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভা সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত প্রকল্পের আওতায় ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের ওপর ২০০টি ডকু-ড্রামা বা ডকুমেন্টারি নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর ১০০টি ডকুমেন্টারি নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে ১২০টি তথ্যচিত্র নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সভায় প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রকল্পের আওতায় সামাজিক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান নির্মাণ কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধসহ বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসকে অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিলের মাধ্যমে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এই নাম ও লক্ষ্য সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পের কর্মপরিধি আরও বৃদ্ধি পাবে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষ হলে এটি দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এটি জাতীয় ইতিহাসের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল আর্কাইভে পরিণত হবে।
পিআইসি সভা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০২৫ সালে জুলাই থেকে শুরু হলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো কাজ হয়নি। প্রকল্পের সামগ্রিক ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। ৪৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে মে পর্যন্ত খরচ হয়েছে মাত্র ৪৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
সভায় জানানো হয়, পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া এবং আরডিপিপি অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকায় মূল সংগ্রহ কার্যক্রম এখনও শুরু করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া জুলাই শহীদদের হালনাগাদকৃত তালিকা বা গেজেট না পাওয়ায় ডকুমেন্টারি তৈরি কাজ শুরু করা যায়নি।
সভায় আরও জানানো হয়, জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা, আহত এবং শহীদদের ওপর ভিত্তি করে ডকুমেন্টারি তৈরির কাজ শুরু করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের কাছে সর্বশেষ হালনাগাদকৃত তালিকা বা গেজেট চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু সভার সময় পর্যন্ত সেই হালনাগাদকৃত গেজেট পাওয়া যায়নি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের প্রতিনিধি জানান, জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের তালিকা হালনাগাদ করার বিষয়টি বর্তমানে একটি চলমান প্রক্রিয়া। সর্বশেষ প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী দ্রুত ডকুমেন্টারি তৈরির কাজ শুরু করা যেতে পারে।
‘সার্চ কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত
পিআইসি সভায় বিস্তারিত আলোচনা শেষে, অডিও-ভিজ্যুয়াল ফুটেজগুলো সঠিকভাবে শনাক্তকরণ ও সংগ্রহের জন্য একটি পুনর্গঠিত সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কমিটিতে স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া জুলাই শহীদদের হালনাগাদ গেজেট অনুযায়ী দ্রুত ডকুমেন্টারি তৈরির কাজ শুরু করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সভায় বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক ও পিআইসি সভায় সভাপতি জাভেদ ইকবাল বলেন, প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরপরই নির্ধারিত নির্দেশিকা অনুযায়ী অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহের মূল কাজ শুরু করতে হবে। প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় না থেকে যে সব কাজের ক্ষেত্রে কোনো নীতিগত বা প্রশাসনিক বাধা নেই (যেমন: ডকুমেন্টারি নির্মাণের প্রস্তুতি), সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। বিশেষ করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য তিনি কর্মকর্তাদের নির্দেশ।





