তিন হাত-পা অচল/স্কুলের বারান্দায় ৪০ বছর কাটানো মাহতাবের আকুতি

দুই পা ও একটি হাত পুরোপুরি অচল। নেই থাকার জায়গা। স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় ৪০ বছর ধরে থাকছেন। শারীরিক এই চরম প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কারও কাছে হাত পাতেন না তিনি, চান না কোনো করুণা। একটি মাত্র সচল হাত দিয়ে তৈরি করেন হাতপাখার হাতল, চেয়ারের হাতল ও বেল্ট। আর সেই সামান্য আয়েই চলছে তার জীবনসংগ্রাম। বলছি সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের বড় ভাটড়া শেখপাড়া গ্রামের মাহতাব হোসেনের কথা।
ভাটড়া শেখপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, একদিকে শ্রেণিকক্ষে ক্লাস চলছে, অন্যদিকে বারান্দার ছোট একটি চকিতে শুয়ে আছেন মাহতাব হোসেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাহতাবের জন্ম এই গ্রামেই। একসময় ঘরবাড়ি, জমিজমা সবই ছিল। কিন্তু ছোটবেলায় এক জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর পরিবারের লোকজন তার সব সম্পত্তি লিখে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এরপর থেকেই এই বিদ্যালয়ের বারান্দাই হয়ে ওঠে তার স্থায়ী আশ্রয়।
বিগত ১৩ বছর ধরে নিঃস্বার্থভাবে মাহতাবের দেখভাল করছেন স্থানীয় বাসিন্দা হাসিনা বেগম। তিনি বলেন, মাহতাব ভাইয়ের এই অবস্থা দেখে আমাদের খুব খারাপ লাগত। তার দেখাশোনা করার কেউ ছিল না। তাই স্বামীর সঙ্গে কথা বলে গত ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে আমরা দুজনেই তার দেখভাল করছি। আমরা যখনই সময় পাই, তাকে খাইয়ে দিই। গোসল করানো থেকে শুরু করে কাপড় ধুয়ে দেওয়াসহ তার যাবতীয় কাজ আমরাই করি।
নিজের জীবনের নির্মমতার কথা তুলে ধরে মাহতাব হোসেন বলেন, ছোটবেলায় সবার মতো আমিও সুস্থ ছিলাম। ১৩ বছর বয়সে হঠাৎ আমার টাইফয়েড জ্বর হয়। এরপর কয়েক বছর মোটামুটি ভালোই ছিলাম, কিন্তু তারপর থেকে ধীরে ধীরে আমার শরীর অচল হতে শুরু করে। আমি যখন পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ি, তখন পরিবারের লোকজন আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। বাধ্য হয়ে এই বিদ্যালয়ের বারান্দায় আশ্রয় নিই। কিছুদিন আশপাশের লোকজন খাবার দিয়ে যেত, কিন্তু পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। তখন আমি নিজে চেষ্টা করে হাতপাখার হাতল, চেয়ারের হাতল ও বেল্ট তৈরি শুরু করি। এ থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে এখন খুব কষ্টে জীবন পার করছি। অনেকে আমাকে ভিক্ষা করতে বলেছিল, কিন্তু আমি তা করিনি। যতদিন বাঁচব, কারও কাছে হাত পাতব না।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে আমার আবেদন—আমার থাকার কোনো জায়গা নেই। আমাকে যদি একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তাহলে শেষ বয়সে একটু সুখে-শান্তিতে থাকতে পারব। এখন স্কুলের বারান্দায় থাকি, ঝড়-বৃষ্টির দিনে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়ে। ঝড় শুরু হলেই মনে হয় আজই বুঝি আমার শেষ দিন। বৃষ্টি হলে সবকিছু ভিজে যায়। বর্তমানে খুবই কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে আমার।
ভাটড়া শেখপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাকিবুল ইসলাম বলেন, মাহতাব হোসেনের বাড়িঘর সবই ছিল, ছোটবেলায় তিনি সুস্থই ছিলেন। ১৩ বছর বয়সে তিনি হঠাৎ একটি রোগে আক্রান্ত হন। পরিবার কিছুদিন চিকিৎসা করানোর পর সুস্থ না হওয়ায় তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এরপর তিনি স্কুলের বারান্দায় আশ্রয় নেন। তার দুই পা ও একটি হাত প্রায় অচল, একা চলাচল করতে পারেন না। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আশপাশের লোকজন তা এগিয়ে দেয়। মাঝে মধ্যে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও তাকে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করে।’
সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি আরও বলেন, মাহতাব হোসেনের থাকার কোনো জায়গা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে তার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দিলে শেষ জীবনে তিনি নিজের একটি ঠিকানা পেতেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, মাহতাব হোসেনের বিষয়টি অবগত হওয়ার পর প্রায় এক মাস আগে আমি নিজে সরেজমিনে গিয়ে তার সার্বিক খোঁজখবর নিয়েছি এবং তাকে দুই বান টিন দিয়ে এসেছি। আগামীতেও তাকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও সহযোগিতা করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।





