ছয় মাস পর আবাসে ফেরা বাঘিনীর গতিবিধি থাকবে নজরদারিতে

এদিক-ওদিক বিচরণের সময় হঠাৎ ফাঁদে আটকা; হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদ। হরিণের বদলে আটকা পড়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ছয় মাস আগে গুরুতর আহত অবস্থায় সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খাল এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় বাঘিনীটিকে। তারপর শুরু হয় তার চিকিৎসা। দীর্ঘ ছয় মাসের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে সে।
রোববার (১২ জুলাই) দুপুরে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক বনাঞ্চলে নিজ আবাসে তাকে অবমুক্ত করা হয়েছে।
এদিন ভোরে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে বিশেষ খাঁচায় করে বাঘিনীটিকে মোংলায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে নৌপথে পূর্ব সুন্দরবনের আন্ধারমানিক এলাকায় নিয়ে দুপুর ১২টার পর বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের উপস্থিতিতে বনে অবমুক্ত করা হয়।

প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বাঘিনীটি এখন পুরোপুরি সুস্থ। প্রজনন মৌসুম ছাড়া রয়েল বেঙ্গল টাইগার সাধারণত নির্দিষ্ট এলাকায় একাই বিচরণ করে। তাই তাকে তার নিজস্ব আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমরা আশা করছি, সে স্বাভাবিকভাবে শিকার করে আবারও বনের স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারবে।
বন সংরক্ষক ছানাউল্লাহ পাটোয়ারী জানান, বাঘিনীটির চলাচল, আচরণ এবং স্বাভাবিকভাবে শিকার করার সক্ষমতা পর্যবেক্ষণের জন্য অবমুক্ত এলাকার প্রায় ৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ২০টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে তার গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) থেকে নির্ধারিত সময়ে স্যাটেলাইট কলার না পাওয়ায় বিকল্প হিসেবে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গত ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খাল এলাকায় শিকারিদের পাতা হরিণ ধরার ছিটকা ফাঁদে প্রায় ১০ বছর বয়সি বাঘিনীটি আটকা পড়ে গুরুতর আহত হয়। পরদিন ট্রাঙ্কুলাইজার ব্যবহার করে তাকে উদ্ধার করে খুলনার বয়রায় অবস্থিত বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ছয় মাস ধরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ, নিয়মিত ড্রেসিং এবং নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন করা হয়।

উদ্ধারের সময় বাঘিনীটির সামনের বাম পায়ের প্রায় তিন ইঞ্চি অংশে চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। ফাঁদের রশির চাপে ক্ষতস্থানে পচনও ধরেছিল। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ক্ষত পুরোপুরি শুকিয়ে যায়, সেখানে নতুন মাংস ও লোম গজায় এবং বাঘিনীটি স্বাভাবিক শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ বলেন, সুন্দরবনের একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার সাধারণত ১৪ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। উদ্ধার হওয়া বাঘিনীটির বয়স প্রায় ১০ বছর। তাই চিকিৎসা শেষে দ্রুত তাকে প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বিজ্ঞানসম্মত ও সময়োপযোগী। দীর্ঘদিন বন্দি অবস্থায় থাকলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও শিকার করার দক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, চিকিৎসার সময় বাঘিনীটির আচরণ, খাদ্য গ্রহণ ও শারীরিক অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। সবকিছু বিবেচনায় সে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকতে সক্ষম হবে বলে আমরা আশাবাদী।





