স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত চা বাগানের শিশুরা

সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক চরম বাস্তবতার নাম চা বাগান। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চা শিল্প বড় ভূমিকা রাখলেও এই শিল্পের প্রাণ যেসব শ্রমিক, তাদের সন্তানেরা আজও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। বিশেষ চা বাগানের শিশুদের অন্যতম প্রধান সমস্যা পুষ্টিহীনতা ও শারীরিক দুর্বলতা। পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে চা বাগানের সিংহভাগ শিশুই মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এতে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং অল্পতেই তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বাগানগুলোর হাসপাতালে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় গুরুতর অসুস্থ শিশুদের নিয়ে যেতে হয় উপজেলা বা জেলা সদরের সরকারি হাসপাতালে। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থা খারাপ হওয়া এবং দূরত্বের কারণে অনেক সময় পথেই শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের জরিপ অনুযায়ী, চা বাগানের ৪৫.১ শতাংশ শিশু খর্বকায় এবং ৪৭.৫ শতাংশ শিশু স্বল্প ওজনের। প্রায় ৯৭ শতাংশ শিশুর জন্ম হয় বাড়িতে এবং দক্ষ চিকিৎসকের সহায়তার হার মাত্র ৩ শতাংশ। অধিকাংশ চা বাগানের নিজস্ব হাসপাতাল বা ডিসপেনসারি থাকলেও সেগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত জরাজীর্ণ। নামেমাত্র এসব চিকিৎসাকেন্দ্রে নেই কোনো এমবিবিএস চিকিৎসক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কম্পাউন্ডার বা অনভিজ্ঞ লোক দিয়ে চলছে চিকিৎসাসেবা। ফলে ঠান্ডা, জ্বর বা গ্যাস্ট্রিকের মতো সাধারণ রোগের জন্য ওষুধ মিললেও শিশুদের জটিল কোনো রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই সেখানে।
এদিকে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি অত্যন্ত সীমিত। এই সামান্য আয় দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ চালাতেই হিমশিম খেতে হয় তাদের। ফলে সন্তানের উন্নত চিকিৎসার খরচ চালানো তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি, শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতাও অনেক কম। অনেক সময় শিশুরা অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে ওঝা বা কবিরাজের শরণাপন্ন হন তারা, যা শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর চা বাগানের শ্রমিক সুমন কৈরী ও রামলাল বাউরী বলেন, আমরা যে মজুরি পাই, তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। আমাদের পরিবারের শিশু ও নারীরা অসুস্থ হলে বাগানের হাসপাতালেই চিকিৎসা করাই। বাগানের বাইরে চিকিৎসা করাতে অনেক খরচ, যা বহন করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। বাইরে চিকিৎসা করাতে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতেই সব টাকা শেষ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা রামভজন কৈরী বলেন, চা বাগানের শিশুরা জন্মের পর থেকেই স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। ভালো স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রথমেই বাগানের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন প্রয়োজন। প্রতিটি চা বাগানের ডিসপেনসারিতে অন্তত একজন করে স্থায়ী এমবিবিএস চিকিৎসক এবং সব ধরনের ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যন্ত বাগানগুলোতে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা চালু করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, টিকাদান এবং পুষ্টি বিষয়ে শ্রমিকদের মধ্যে নিয়মিত সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা জরুরি।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, চা বাগানের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর সার্বিক অবস্থা তদারকি করা হবে। কোম্পানিগুলোর নিজস্ব হাসপাতালের পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে যেন এই শিশুরা শতভাগ স্বাস্থ্যসেবা পায়, তা নিশ্চিত করা হবে। চা বাগানের প্রতিটি শিশু যেন সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে, সে লক্ষ্যে স্বাস্থ্য বিভাগ আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
.png)






