১৭ বার ঘর সরিয়েও তিস্তার হাত থেকে রক্ষা মেলেনি সুফিয়ার

এশিয়া পোস্ট নিউজ, নীলফামারী
১৭ বার ঘর সরিয়েও তিস্তার হাত থেকে রক্ষা মেলেনি সুফিয়ার
তিন দশক ধরে তিস্তায় ঘর হারানোর আতঙ্ক নিয়ে বাস করছেন সুফিয়া খাতুন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

প্রতি বর্ষায় তিস্তার পানি বাড়লেই আতঙ্কে দিন কাটে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব বাইশপুকুর গ্রামের সুফিয়া খাতুনের। নদীর ভাঙন তার কাছে নতুন কিছু নয়। গত তিন দশকে তিস্তার আগ্রাসনে ১৭ বার বসতঘর সরাতে হয়েছে তাকে। তবু এখনও নিশ্চিত নন, বর্তমান আশ্রয়টুকু কতদিন টিকবে।

সুফিয়া খাতুন বলেন, ১৯৯৬ সালের বন্যার পর থেকেই আমার দুর্ভোগ শুরু। ওই বন্যাই আমার জীবনের কাল হয়ে আসে। এরপর একের পর এক ভাঙনে ১৭ বার ঘর সরাতে হয়েছে। নদী শুধু ঘরবাড়িই নেয়নি, আমার স্বামীকেও হারিয়েছি। পাঁচ সন্তানকে নিয়ে অনেক কষ্টে জীবন পার করেছি। এখন বয়স হয়েছে, কিন্তু তিস্তার ভয় এখনও যায়নি।

তিস্তাপাড়ের মানুষের ভাষ্য, ১৯৯৬ সালের বন্যা ছিল এ অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগগুলোর একটি। সে সময় নদীর তীব্র স্রোত ও ভাঙনে হাজারো পরিবার বসতভিটা হারায়। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় বিস্তীর্ণ জনপদ ও ফসলি জমি। অনেক পরিবার আজও সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

ডিমলার তিস্তা তীরবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সুফিয়া খাতুনের মতো আরও অনেক পরিবার বছরের পর বছর নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করছেন। কেউ কয়েকবার, কেউ ১০ থেকে ১৫ বার, আবার কেউ ২০ বারেরও বেশি ঘর সরিয়েছেন। অনেকের বাড়ি এখনও নদীর কিনারায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নতুন করে পানি বাড়লেই শুরু হয় দুশ্চিন্তা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বন্যা ও ভাঙনের সময় জরুরি কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ চোখে পড়ে না। ফলে একই দুর্ভোগ বছরের পর বছর বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তিস্তাপাড়ের মানুষকে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির নীলফামারী জেলার আহ্বায়ক আন্তাজুল ইসলাম বলছেন, তিস্তা অববাহিকায় প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙনে কৃষিজমি, বসতবাড়ি এবং অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকা। তার মতে, স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের পরিবর্তে নদীশাসন এবং তিস্তার দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

এদিকে তিস্তার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও ভাঙনের শঙ্কায় দিন গুনছেন সুফিয়া খাতুন। তার একটাই প্রশ্ন, আর কতবার ঘর সরালে তিস্তা তাকে ছেড়ে দেবে?

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, তিস্তা নদীর ভাঙন রোধে ইতোমধ্যে ৩৯ কোটি ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে ৭ দশমিক ৩৫০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নতুন করে ভাঙনকবলিত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব এলাকায় নদীতীর সংরক্ষণ কাজ শুরু করা হবে।