৪০০ বছর ধরে প্রবহমান ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী রথ

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ধামরাই (ঢাকা)
৪০০ বছর ধরে প্রবহমান ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী রথ
ঢাকার ধামরাইয়ে অবস্থিত রথ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বাংলাদেশ, ভারতসহ অনেক জনপদে বাংলা আষাঢ় মাসে পালিত হয় রথযাত্রা উৎসব। শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের নামে সব জায়গায় এ উপাসনার আয়োজন করা হয়ে থাকে; ব্যতিক্রম রয়েছে একটি অঞ্চলে। ঢাকার ধামরাইয়ে উৎসবটি পালিত হয় শ্রী যশোপালের (পরে যশোমাধব) নামে। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৪০০ বছর ধরে প্রবহমান রথের ইতিহাস।

বাংলা পঞ্জিকার প্রতি বছরের আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে পালিত হয় রথযাত্রা। সে হিসাবে রোববার (১৬ জুলাই) ধামরাই বাজারের রথখোলা এলাকা থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত প্রথমে রথটান ও পরে ২৪ জুলাই উল্টোরথের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।

প্রবহমান ইতিহাস

প্রচলিত আছে–ধামরাই রথের সূচনা হয় ১০৭৯ বঙ্গাব্দে। ৪০০ আগে পাল বংশের রাজা যশোপাল হাতির পিঠে চড়ে ধামরাইয়ের একটি এলাকায় যাচ্ছিলেন। বন-জঙ্গলে ঘেরা পথে চলতে গিয়ে এক ঢিবির সামনে থেমে যায় হাতিটি। উপায় না পেয়ে সেই ঢিবি খননের নির্দেশ দেন রাজা। খননের পর ঢিবির নিচ থেকে পাওয়া যায় একটি মন্দির ও কয়েকটি মূর্তি। মূর্তিগুলো বাড়িতে আনেন রাজা।

রাতে স্বপ্নে দেখেন মাধব দেবতাকে। তিনি রাজাকে নির্দেশ দেন পূজা করার ও নিজের সঙ্গে মাধব নাম বসিয়ে নেওয়ার। যশোপালের নাম হয়ে যায় যশোমাধব। সময়টি ছিল চন্দ্র আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথি। সেই থেকেই শুরু হয় যশোমাধবের রথযাত্রা। প্রতি বছর একই সময়ে হয়ে আসছে রথযাত্রা।

পরে ১২০৪ থেকে ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ঢাকা জেলার সাটুরিয়া থানার বালিয়াটির জমিদাররা বংশানুক্রমে এখানে চারবার রথ তৈরি করেন। ১৩৪৪ সালে রথের ঠিকাদার ছিলেন নারায়ণগঞ্জের স্বর্গীয় সূর্য নারায়ণ সাহা; সে সময় রথ তৈরি করতে সময় লাগে এক বছর।

ধামরাই, কালিয়াকৈর, সাটুরিয়া, সিঙ্গাইর থানার বিভিন্ন কাঠশিল্পী যৌথভাবে নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করে ৬০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন রথটি তৈরি করেন। এ রথটি ত্রিতলবিশিষ্ট ছিল, যার প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় চার কোণে চারটি প্রকোষ্ঠ ও তৃতীয় তলায় একটি প্রকোষ্ঠ ছিল। বালিয়াটির জমিদাররা চলে যাওয়ার পর রথের দেখভালের দায়িত্ব পালন করে টাঙ্গাইলের রণদাপ্রসাদ সাহার পরিবার।

রথ সংস্কারে ব্যস্ত এক রংশিল্পী। ছবি: এশিয়া পোস্ট
রথ সংস্কারে ব্যস্ত এক রংশিল্পী। ছবি: এশিয়া পোস্ট

২০১০ সালে ধামরাইয়ে পুরোনোটির আদলে নতুন রথ নির্মাণ করা হয়। ৪০ জন কাঠশিল্পী ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ৩৭ ফুট উচ্চতা ও ২০ ফুট প্রস্থের কারুকার্যখচিত নতুন রথটি নির্মাণ করেন। লোহার খাঁচার ওপর সেগুন ও চাম্বল কাঠ বসিয়ে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে আকর্ষণীয় সব শৈল্পিক নিদর্শন।

এতে রয়েছে লোহার তৈরি ১৫টি চাকা। রথের সামনে রয়েছে কাঠের তৈরি দুটি ঘোড়া ও সারথি। এ ছাড়া রথের বিভিন্ন ধাপে প্রকোষ্ঠের মাঝে স্থাপন করা হয়েছে কাঠের তৈরি দেব-দেবীর মূর্তি। প্রতি বছর রথযাত্রার আগে রং চড়ানো ও সাজসজ্জার কাজ করে এটিতেই অনুষ্ঠিত হয় রথ উৎসব।

রথযাত্রা ঘিরে ব্যস্ততা

এবারও রথযাত্রা উপলক্ষে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী রথটি। সাজিয়ে তোলার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। উৎসব যথাযথভাবে পালনে প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন।

আয়োজকরা জানান, রোববার ধামরাই বাজারের রথখোলা এলাকা থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত প্রথমে রথটান ও পরে ২৪ জুলাই উল্টোরথের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। রথকে কেন্দ্র করে ১৬ জুলাই থেকে পরের এক মাস চলবে ঐতিহ্যবাহী মেলা।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে ধামরাই উপজেলা পরিষদসংলগ্ন রথখোলায় গিয়ে রথের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির ব্যস্ততা দেখা যায়।

রথের দেখভালের দায়িত্বে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানান, রথটি সারা বছর বাইরে খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়। এ জন্য রং মলিন হয়ে যায়। কিন্তু রথযাত্রার আগে এটিকে পুরোপুরি সাজিয়ে তোলা হয়। সংস্কারের কাজ এই সময়ে করা হয়।

রথের খুঁটির দেয়ালের দেবতাদের প্রতিমার প্রতিকৃতি রং করছিলেন সঞ্জয় পাল নামের এক রংশিল্পী। তিনি বলেন, ১১ বছর ধরে রথের সাজসজ্জা ও মেরামতের কাজ করছি। এ বছরও গত কয়েকদিন ধরে রথ সংস্কার কাজ করছি। এই কাজ শুধু পেশা হিসেবে নয়, নিজের ভালোলাগা থেকে করি।

প্রদীপ চৌধুরী নামে অপর এক রংমিস্ত্রি বলেন, ভগবানের কৃপা ও মানুষের আশীর্বাদ পেতে এই রথে কাজ করছি। প্রত্যেকটি কাঠের কাঠামোয় রংয়ের প্রয়োজনীয় কাজ করা হচ্ছে। তবে বৃষ্টির জন্য কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে। আশা করছি দ্রুত কাজ শেষ হবে।

রথ সংস্কারে ব্যস্ত এক শ্রমিক। ছবি: এশিয়া পোস্ট
রথ সংস্কারে ব্যস্ত এক শ্রমিক। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সার্বিক প্রস্তুতি

রথযাত্রার সর্বশেষ প্রস্তুতির বিষয়ে ধামরাই যশোমাধব মন্দির পরিচালনা পর্ষদের সহসভাপতি নন্দ গোপাল সেন বলেন, থানা, উপজেলা প্রশাসন ও এমপির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা আশ্বস্ত করেছেন–অন্যান্য বছরের মতো এবারও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় উৎসবমুখর পরিবেশে রথযাত্রা উৎসব পালিত।

তিনি বলেন, উৎসব সুন্দরভাবে পালন করতে বেশ কয়েকটি উপকমিটি করে থাকি। সেগুলো কাজ শুরু করেছে। রথের কাঠের কাজ শেষ হয়েছে। রংয়ের কাজ করা হচ্ছে। বৃষ্টির জন্য কাজে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও সঠিক সময়ে কাজ শেষ করে সুন্দর পরিবেশে রথযাত্রা উৎসব পালন করতে পারব।

ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হুদা খান বলেন, হিন্দু ধর্মালম্বীদের অন্যতম বড় উৎসব রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব স্থানে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। উৎসব সুন্দরভাবে পালন করতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল মামুন বলেন, রথযাত্রা উপলক্ষে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক অবগত রয়েছেন। তিনি সার্বিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

ইউএনও আরও বলেন, আশা করছি অন্যান্য বছরের মতো এবারও উৎসবমুখর পরিবেশে রথযাত্রা উদযাপিত হবে। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনও কাজ করছে।