হবিগঞ্জে বন্যায় কৃষি ও মৎস্য খাতে ৬২ কোটি টাকার ক্ষতি

হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় শুধু ঘরবাড়িই প্লাবিত হয়নি, ভেসে গেছে হাজারো কৃষক ও মৎস্যচাষির বছরের পরিশ্রম, স্বপ্ন আর জীবিকার অবলম্বন। ঋণ নিয়ে করা সবজি চাষ, ধানের ক্ষেত, মাছভর্তি পুকুর—সবকিছু মুহূর্তেই তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে। পানি নেমে যাওয়ার পর এখন সামনে আসছে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কৃষি ও মৎস্য খাত মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৬২ কোটি টাকা। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের নোয়াবাদ গ্রামের বর্গাচাষি ফজল মিয়া এবার এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দুই বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করেছিলেন। ফলনও হয়েছিল আশানুরূপ। বাজারে বিক্রি করে ঋণ শোধের পাশাপাশি সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হঠাৎ আসা বন্যার পানিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডুবে যায় পুরো ক্ষেত। পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে ঝুলছে শুধু পচে যাওয়া বেগুন।
ফজল মিয়া বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে ঋণ নিয়ে বেগুন চাষ করছিলাম। সব শেষ হয়ে গেছে। এখন ঋণ কীভাবে শোধ করব, সংসার কীভাবে চালাব—কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’
একই গ্রামের কৃষক মোস্তফা মিয়ার অবস্থাও একই। বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে তার পুঁইশাকের ক্ষেত। উৎপাদনের আশায় যে অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন, তা এখন পুরোপুরি লোকসানে পরিণত হয়েছে। সামনে নতুন করে চাষাবাদের পুঁজি জোগাড় করাও তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু কৃষকই নন, মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন মাছচাষিরাও। সদর উপজেলার লস্করপুর এলাকার মাছচাষি আরজু মিয়া বলেন, অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তিনি পুকুরের মাছ বিক্রির পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় পুকুরের সব মাছ ভেসে যাওয়ায় সেই আশাও শেষ হয়ে গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যায় জেলার ১ হাজার ২৮৬ হেক্টর আউশ ধান, ২৪৮ হেক্টর শাকসবজি, ১৫৫ হেক্টর বীজতলা এবং ২০ হেক্টর ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১৮ হাজার ২৫৫ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি টাকা।

হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার পাল বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রণোদনার বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বীজ, সার ও অন্যান্য সহায়তা বিতরণ করা হবে।
তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে জেলার মৎস্য খাত। জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১ হাজার ৪৫৩টি পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৬১৩ টন মাছ এবং প্রায় সাড়ে চার কোটি মাছের পোনা ভেসে গেছে। পুকুরের অবকাঠামোসহ এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪৮ কোটি টাকা।
হবিগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শরীফুল আলম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসনের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, পোনা সরবরাহ এবং বিভিন্ন প্রণোদনার প্রস্তাব ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হবে।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহের বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়ন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারি সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
গত ৯ জুলাই রাতে টানা ভারী বৃষ্টি এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে যায়। প্রবল স্রোতের মুখে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে পড়ে। মুহূর্তেই প্লাবিত হয় অন্তত ২০টি গ্রাম। ঘরবাড়ি, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি, সবজিক্ষেত ও মাছের খামার তলিয়ে যায় পানির নিচে।
পানি নামতে শুরু করলেও বন্যার ক্ষত এখনও শুকায়নি। ক্ষেতজুড়ে পড়ে আছে পচে যাওয়া সবজি, কাদামাখা ধানের জমি আর খালি মাছের পুকুর। ঋণের বোঝা, নতুন করে চাষাবাদের অনিশ্চয়তা এবং জীবিকা হারানোর শঙ্কা নিয়ে দিন কাটছে হাজারো কৃষক ও মাছচাষির।
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, শুধু প্রণোদনা নয়, দ্রুত আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, মাছের পোনা, বীজ ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে অনেকেই নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না। তাদের ভাষায়, বন্যার পানি নেমে গেলেও অনিশ্চয়তার যে স্রোত শুরু হয়েছে, তা থামাতে এখন প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর সরকারি উদ্যোগ।




