খাগড়াছড়ি শহরের প্রবেশমুখেই ময়লার স্তূপ, অতিষ্ঠ পর্যটক-স্থানীয়রা

খাগড়াছড়ি পর্যটন শহরের প্রবেশমুখ আলুটিলায় দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ময়লা-আবর্জনা ফেলছে খাগড়াছড়ি পৌরসভা। এতে তীব্র দুর্গন্ধে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হওয়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। এদিকে, প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পৌরসভার আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটি কোনো কাজে না আসায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় পথচারী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন খাগড়াছড়ি-ঢাকা সড়ক দিয়ে যাতায়াত করি। শহরের প্রবেশমুখেই ময়লার দুর্গন্ধে চলাচল করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। বৃষ্টি হলে দুর্গন্ধ আরও বেড়ে যায়। শহরের সৌন্দর্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে দ্রুত এই ময়লার ভাগাড় অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া উচিত।
পাবনা থেকে আসা পর্যটক সোহেল রহমান বলেন, প্রথমবারের মতো খাগড়াছড়ি বেড়াতে এসে শহরের প্রবেশমুখে এমন ময়লার স্তূপ দেখে খুব খারাপ লেগেছে। আলুটিলার মতো সুন্দর একটি পর্যটন এলাকার পাশে এভাবে বর্জ্য ফেলা মোটেও মানানসই নয়। এতে পর্যটকদের কাছে খাগড়াছড়ি সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যায়।
খাগড়াছড়ির কুমিল্লা টিলা ডাম্পিং স্টেশন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, বছরের পর বছর ধরে আমরা দুর্গন্ধ আর মশা-মাছির যন্ত্রণা ভোগ করছি। অনেক সময় বর্জ্য পোড়ানো হলে ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ফলে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আমাদের মশারি টাঙিয়ে ভাত খেতে হয়। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই দুর্গন্ধ ছড়ায়। আমরা চাই জনবসতিশূন্য এলাকায় এই ডাম্পিং স্টেশন দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হোক।
১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত খাগড়াছড়ি পৌরসভার আয়তন ১৩ দশমিক ৫০ বর্গমাইল এবং লোকসংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। তৃতীয় শ্রেণির খাগড়াছড়ি পৌরসভা কালের বিবর্তনে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখনও পুরনো পথেই হাঁটছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে খাগড়াছড়ি সদরের জিরোমাইল এলাকায় গোলাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের খাগড়াছড়ি-ঢাকা আঞ্চলিক সড়কের পাশে পাহাড়ের খোলা স্থানে পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে এই বর্জ্য বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়ালেও বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে তা মিশে চেঙ্গী নদীতে গিয়ে পড়ে। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে পর্যটকসহ স্থানীয়দের জীবনযাত্রায়।
খাগড়াছড়ি পৌরসভা ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকার ও এডিবির অর্থায়নে পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের কুমিল্লাটিলায় ১১ একর ভূমির ওপর নয় কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন করে। তবে প্রকল্পটি চালু হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। ফলে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য বাছাই করে পরিশোধন এবং জৈব সার তৈরি করাসহ আধুনিক পদ্ধতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যে লক্ষ্য ছিল, তার কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি। প্রকল্পের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা অভিযোগ রয়েছে।
খাগড়াছড়ির ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. রতন খীসা বলেন, পৌর শহরের প্রবেশমুখে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকায় সেখান থেকে দুর্গন্ধ ও দূষিত বায়ু ছড়িয়ে পড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। এ ধরনের পরিবেশে মশা-মাছির বংশবিস্তার বাড়ে এবং ডায়রিয়া, আমাশয়, শ্বাসকষ্ট ও ত্বকের সংক্রমণসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত ময়লা অপসারণ ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
খাগড়াছড়ি পৌরসভার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই না করায় সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে। জেলা পরিবেশ সুরক্ষা কমিটির সভায় বিভিন্ন সময় এ বিষয়ে আলোচনা হলেও কোনো সুফল মিলছে না। এরপরও খাগড়াছড়ি পৌরসভা অন্যত্র ময়লা ফেলার জন্য নতুন জায়গা নির্বাচন করছে। আশা করি, দ্রুত এর একটি আশু সমাধান হবে।
এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি তরুণ কুমার ভট্টাচার্য বলেন, অপরিকল্পিতভাবে প্রকল্প নেওয়ায় সরকারের বিপুল অর্থ গচ্চা গেছে। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ভাগাড়টি দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া দরকার।
খাগড়াছড়ি পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হাছান আহম্মদ বলেন, খাগড়াছড়ি পৌর শহরে প্রবেশের মুখে ময়লার ভাগাড়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান হবে।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, খাগড়াছড়ি পৌরসভার ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করা হলেও আপাতত সেখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে না। এ বিষয়ে পৌরসভাকে বারবার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জায়গা পরিবর্তনের কাজ চলমান রয়েছে বলে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। নতুন জায়গা পেলে সবার সমন্বয়ে এটার দ্রুত সমাধান হবে।
.png)






