Advertisement

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ক্লিনিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চরম অব্যবস্থাপনা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ক্লিনিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চরম অব্যবস্থাপনা
পৌরসভার বর্জ্যবাহী গাড়িতে ফেলা হচ্ছে ময়লা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চিকিৎসা বর্জ্য (ক্লিনিক্যাল ওয়েস্ট) ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম চিকিৎসা বর্জ্য পৃথকভাবে সংগ্রহ করা হলেও শেষ পর্যন্ত পৌরসভার বর্জ্যবাহী গাড়িতে সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে ডাম্পিং স্টেশনে ফেলা হচ্ছে। ফলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি সংক্রামক রোগ বিস্তারের আশঙ্কাও বাড়ছে।

জেলা শহরে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতাল, সরকারি মাতৃসদন, বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মিলিয়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন সংক্রমণ-ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য বের হয়।

স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, স্যালাইন ব্যাগ, রক্তমাখা গজ ও ক্যানুলাসহ চিকিৎসা বর্জ্য আলাদা পাত্রে সংরক্ষণ এবং বিশেষ ব্যবস্থায় ধ্বংস করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, হাসপাতালগুলো আলাদা ড্রামে বর্জ্য সংরক্ষণ করলেও পৌরসভার গাড়ি সংগ্রহের সময় সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে একত্রে নিয়ে যায়। পরে শহরের ডাম্পিং স্টেশনে একসঙ্গে ফেলে রাখা হয়।

পৌর এলাকার ছয়বাড়ি এলাকার ডাম্পিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বর্জ্যের স্তূপ থেকে ছিন্নমূল শিশুরা ব্যবহৃত স্যালাইন ব্যাগ, সিরিঞ্জ ও প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন সামগ্রী আলাদা করছেন। এগুলো পরিষ্কার করে তারা ভাঙারি দোকানে বিক্রি করে।

ডাম্পিং স্টেশনের কেয়ারটেকার ফিরোজ মিয়া জানান, বিভিন্ন হাসপাতাল ও হোটেলের বর্জ্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা হয়। টোকাইরা সেখান থেকে প্লাস্টিক ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।

প্লাস্টিক সংগ্রহকারী আবদুল্লাহ জানান, পরিবার-পরিজন মিলে এসব বর্জ্য পরিষ্কার করে আলাদা করেন। পরে সেগুলো ভাঙারি দোকানে বিক্রি করেই তাঁদের জীবিকা চলে।

আব্দুল্লাহ জানান, ডাম্পিং স্টেশন থেকে এসব বর্জ্য সংগ্রহের সুযোগ পেতে বর্জ্যবাহী গাড়ির চালক ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়। যদিও পৌরসভার বর্জ্যবাহী গাড়ির চালক তাজুল ইসলাম এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।

একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক জানান, চিকিৎসা বর্জ্য নিরাপদভাবে অপসারণের জন্য তাঁরা প্রতি মাসে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে পৌরসভাকে তিন হাজার টাকা করে পরিশোধ করেন। কিন্তু নির্ধারিত নিয়মে এসব বর্জ্য ধ্বংস না করে সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গ সংলগ্ন ডাস্টবিনেও সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে চিকিৎসা বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ডাস্টবিনের টিনশেড নষ্ট থাকায় বৃষ্টিতে ভিজে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, পৌরসভার গাড়ি নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

একাধিক চিকিৎসকের মতে, চিকিৎসা বর্জ্য যথাযথভাবে ধ্বংস না করলে হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, এইচআইভি ও টিটেনাসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পুনর্ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই চিকিৎসা বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও ধ্বংসের পুরো প্রক্রিয়াকে আধুনিক ও কঠোর নজরদারির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালি বলেন, সংক্রমণ ঘটাতে পারে এমন বর্জ্য হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ধ্বংস করা হয়। তবে সাধারণ বর্জ্য নিয়মিত অপসারণের দায়িত্ব পৌরসভার। তারা সময়মতো দায়িত্ব পালন করলে এ সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

বেসরকারি ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি ডা. মকবুল হোসেন বলেন, চিকিৎসা বর্জ্য নির্ধারিত নিয়মে সংরক্ষণের জন্য সব প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে না হলে জনস্বাস্থ্যের জন্য তা ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করবে।

নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষা সংগঠন ‘তরী বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, চিকিৎসা বর্জ্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব বর্জ্য সংগ্রহ করছেন। আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার প্রশাসকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক শরীফুল ইসলাম বলেন, বর্তমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু ঘাটতি ও অনিয়ম রয়েছে। এগুলো দূর করতে ওয়ার্ডভিত্তিক ঠিকাদার নিয়োগসহ আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. নোমান মিয়া বলেন, ক্লিনিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনও শতভাগ নিরাপদ করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। অন্যথায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।