Advertisement

এইচএসসি ও সমমান/মানিকগঞ্জে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ কমার কারণ কী

অভি হাসান, মানিকগঞ্জ
মানিকগঞ্জে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ কমার কারণ কী
পরীক্ষা দিচ্ছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সারা দেশে চলছে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি ও সমমান) পরীক্ষা। প্রতিটি পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থীকে অনুপস্থিত দেখা যাচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীর নাম থাকছে অনুপস্থিতির তালিকায়। সবশেষ রোববার (১৯ জুলাই) অনুষ্ঠিত ৯টি শিক্ষা বোর্ডে ২২ হাজার ৫৭১ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন।

জেলাভিত্তিক অনুপস্থিতির হার কেমন–যাচাই করার জন্য ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন মানিকগঞ্জ নিয়ে অনুসন্ধান করেছে এশিয়া পোস্ট। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এ জেলায় প্রথম ১০ দিনে (১৯জুলাই পর্যন্ত) এক হাজার ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেননি।

মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের (শিক্ষা শাখা) তথ্যানুযায়ী, জেলায় এবার মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৬১ হাজার ৬৭৫। প্রথম ১০ দিনে অনুপস্থিতির হার তিন দশমিক চার শতাংশ। একই সময়ে অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে বহিষ্কার হয়েছে তিনজন পরীক্ষার্থী।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, কিছু শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার পেছনে রয়েছে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব। অনেকে ব্যক্তিগত কারণে মানসিক চাপ থেকে অংশ নিচ্ছেন না। এই দুটি বিষয় সঠিকভাবে যাচাই করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া উচিত এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

জেলা শহরে অবস্থিত সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহফিল খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, অনুপস্থিতির এই চিত্র শুধু পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে মানসিক চাপ, আর্থিক ও পারিবারিক সমস্যা, অসুস্থতা কিংবা ঝরে পড়ার মতো কারণ থাকতে পারে। এসব কারণ চিহ্নিত করে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে অনুপস্থিতির প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

অধ্যাপক মুহম্মদ মাহফিল খানের বিশ্লেষণের সামঞ্জস্য পাওয়া গেল শিক্ষার্থী রায়হানের (ছদ্মনাম) সঙ্গে কথা বলে। মানিকগঞ্জ শহরের একটি কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। নিজেকে অপ্রস্তুত মনে করে তিনি পরীক্ষায় অংশ নেননি। নিজের ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় প্রকাশ না করে তিনি কথা বলেন এশিয়া পোস্টের সঙ্গে।

তিনি বলেন, কয়েক মাস ধরে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে ঠিকমতো পড়াশোনা করা হয়নি। পরীক্ষার আগে নিজেকে প্রস্তুত মনে হয়নি। মানসিক চাপও ছিল অনেক। তাই শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়া হয়নি। এখন সিদ্ধান্তের জন্য খারাপ লাগছে। আগামী বছর ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার চেষ্টা করব।

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক রোকেয়া বেগম বলেন, এইচএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তাই কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষা না দিলে সেটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। অনেকের অসুস্থতা বা পারিবারিক সমস্যা থাকতে পারে। তবে যাদের প্রস্তুতির অভাব বা মানসিক চাপে পরীক্ষা দিতে পারেনি, তাদের পাশে পরিবার ও শিক্ষকদের আরও বেশি দাঁড়ানো দরকার।

দৈনিক অনুপস্থিতি

মানিকগঞ্জ জেলার দৈনিক উপস্থিতি প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, প্রথম দিন বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় সাত হাজার ৮৮৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৯১ জন অনুপস্থিত ছিলেন। দ্বিতীয় দিন বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষায় একই সংখ্যক পরীক্ষার্থীর মধ্যে অনুপস্থিত ছিলেন ২২৮ জন।

তৃতীয় দিন ইংরেজি প্রথমপত্র পরীক্ষায় ৯ হাজার ৬৮৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৮৬ জন অনুপস্থিত ছিলেন। ওই দিন অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে দুইজন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। চতুর্থ দিন ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষায় ৯ হাজার ৬৮৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৯৪ জন অনুপস্থিত ছিলেন।

পঞ্চম দিন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পরীক্ষায় ৮ হাজার ৫৯৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৬৭ জন অনুপস্থিত ছিলেন। ষষ্ঠ দিন পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্র, হিসাববিজ্ঞান প্রথমপত্র ও যুক্তিবিদ্যা প্রথমপত্র পরীক্ষায় ৩ হাজার ৭৮৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৩৯ জন অনুপস্থিত ছিলেন।

সপ্তম দিন পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয়পত্র, হিসাববিজ্ঞান দ্বিতীয়পত্র ও যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষায় একই সংখ্যক পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৩৮ জন অনুপস্থিত ছিলেন।

অষ্টম দিন ভূগোল প্রথমপত্র পরীক্ষায় ১ হাজার ৯০৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৭ জন অনুপস্থিত ছিলেন। এদিন অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে একজন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। নবম দিন অনুষ্ঠিত ভূগোল দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষায় ১ হাজার ৯০৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬০ জন অনুপস্থিত ছিলেন।

সবশেষ রোববার অনুষ্ঠিত রসায়ন তত্ত্বীয় প্রথমপত্র, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রথমপত্র, গৃহ ব্যবস্থাপনা ও পারিবারিক জীবন প্রথমপত্র এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বিপণন প্রথমপত্র পরীক্ষায় ৬ হাজার ৫৫৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২১৭ জন অনুপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা কী বলছেন

জেলা শহরের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকে পরীক্ষা দিচ্ছেন আজমল খান। তিনি যে কক্ষে পরীক্ষা দিচ্ছেন, সেখানে নিয়মিত কয়েকটি আসন ফাঁকা থাকে।

তিনি জানান, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকা কয়েকজন সহপাঠীকেও পরীক্ষা দিতে দেখেননি। পরে জানতে পারেন, কেউ অসুস্থতার কারণে, আবার কেউ পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।

ঘিওর উপজেলার সরকারি ভিকু মেমোরিয়াল কলেজের পরীক্ষার্থী নাফিসা আক্তার বলেন, পরীক্ষা শুরুর আগে সবাই একসঙ্গে প্রস্তুতি নিয়েছি। শেষ মুহূর্তে অনেক সহপাঠী অনুপস্থিত থাকায় খারাপ লাগে। অনুপস্থিতির প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের সহকারী অধ্যাপক জাফর ইকবাল বলেন, পরীক্ষায় অনুপস্থিতির পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। কেউ দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকে, কারও পারিবারিক বা আর্থিক সমস্যা থাকে, আবার কেউ পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেয় না। তবে ধারাবাহিকভাবে অনুপস্থিতির সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

সার্বিক বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা সহকারী কমিশনার (শিক্ষা) উম্মে কানিজ ফাতেমা বলেন, অনুপস্থিতি ও বহিষ্কারের বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।