বেতন-ভাতা নেই, ডুমুরিয়ায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ মাধ্যমিক বিদ্যালয়

এশিয়া পোস্ট নিউজ, খুলনা
বেতন-ভাতা নেই, ডুমুরিয়ায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ মাধ্যমিক বিদ্যালয়
বি কে এম এস মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় শিক্ষকদের চরম অনীহা, ব্যবস্থাপনা কমিটির দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক জটিলতায় খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বি কে এম এস মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি গত পাঁচ বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী নেই। পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা কোটি টাকার দ্বিতল ভবনটি এখন স্থানীয় মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই বিদ্যাপীঠটি বন্ধ হওয়ায় এলাকার বহু শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে, আর অভিভাবকরা পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়।

Advertisement

এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়াতে স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের উদ্যোগে ২০০৫ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুর দিকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক, ফলাফলও ছিল বেশ ভালো। তবে দীর্ঘদিন পার হলেও শিক্ষক-কর্মচারীরা কোনো সরকারি বেতন-ভাতা (এমপিও সুবিধা) পাননি। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়টি কাগজ-কলমে এমপিওভুক্ত হলেও ম্যানেজিং কমিটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সময়মতো বেতন-ভাতার বিল-ভাউচার দাখিল করা হয়নি। ফলে বছরের পর বছর বিনা বেতনে কাজ করতে করতে শিক্ষকরা একপর্যায়ে স্কুলে আসা বন্ধ করে দেন। শিক্ষকদের অনুপস্থিতিতে শিক্ষার্থীরাও ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে এবং ৫ বছর আগে চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যালয়ের ঘণ্টা।

বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এলাকার অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তান পড়াশোনা থেকে ছিটকে পড়েছে। তবে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অধিকাংশ অভিভাবক বাধ্য হয়ে অনেক দূরে পার্শ্ববর্তী কাঁঠালতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও এ কে বি কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সন্তানদের ভর্তি করিয়েছেন।

বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা সুভাষ মণ্ডল, বাসুদেব মণ্ডল, প্রীতম মণ্ডল ও পিয়া মণ্ডলসহ একাধিক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষকদের বেতন না থাকায় তারা আসা বন্ধ করে দেন, আর শিক্ষকরা না থাকায় আমাদের ছেলেমেয়েরাও স্কুলবিমুখ হয়ে পড়ে। এভাবে একটা আস্ত স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে তা ভাবিনি। আমাদের ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো শিক্ষকরা কতদিন আর বিনা বেতনে খাটবেন?

এদিকে সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, নিঝুম ও পরিত্যক্ত ভবনের বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে চলে নেশাগ্রস্তদের আনাগোনা ও জুয়ার আসর। শুধু তাই নয়, তদারকির অভাবে নিচতলার বারান্দা এখন স্থানীয়দের ধান ও পশুখাদ্য সংরক্ষণের আস্তাকুঁড় বা গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের এমন পরিণতির জন্য একে অপরের গাফিলতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক তাপস মণ্ডল বলেন, মূলত ম্যানেজিং কমিটি ও শিক্ষকদের চরম গাফিলতির কারণেই বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়েছে, অন্য কোনো জটিলতা ছিল না। তবে এলাকার মানুষ যদি আবারও স্কুলটি চালুর উদ্যোগ নেয়, আমি সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি ও জমিদাতা শিক্ষক (অব.) শঙ্কর প্রসাদ মণ্ডল এবং শিক্ষানুরাগী শিশির চন্দ্র মণ্ডল জানান, দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পাওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে যে অনীহা তৈরি হয়েছিল, তারই চূড়ান্ত পরিণতি এই অচলাবস্থা।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার দেবাশীষ বিশ্বাস জানান, দীর্ঘদিন বিদ্যালয়টির কোনো কর্যক্রম না থাকায় বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে।

বিষয় :খুলনা