Advertisement

শরীর দিচ্ছে নীরব সংকেত, চিনে নিন হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
শরীর দিচ্ছে নীরব সংকেত, চিনে নিন হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ
ছবি : সংগৃহীত

অনেকেই সারাক্ষণ ক্লান্ত বোধ করেন, ওজন বেড়ে যায়, ঠান্ডা বেশি লাগে বা ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়ে। বেশির ভাগ মানুষ এসবকে ব্যস্ত জীবন, বয়স বা আবহাওয়ার প্রভাব বলে মনে করেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এসব লক্ষণের পেছনে থাকতে পারে থাইরয়েডের একটি সাধারণ সমস্যা, যার নাম হাইপোথাইরয়েডিজম।

হাইপোথাইরয়েডিজম হলে থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করতে পারে না। ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। শুরুতে লক্ষণগুলো খুব স্পষ্ট না হওয়ায় অনেকেই বিষয়টি বুঝতে পারেন না।

হাইপোথাইরয়েডিজম কী?

থাইরয়েড হলো গলার সামনের দিকে প্রজাপতির মতো আকৃতির একটি ছোট গ্রন্থি। এটি মূলত টি-৩ এবং টি-৪ নামে দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি করে। এই হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া, শরীরের তাপমাত্রা, হৃদ্‌স্পন্দন এবং শক্তি ব্যবহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।

যখন থাইরয়েড পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করতে পারে না, তখন সেই অবস্থাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বা আন্ডারঅ্যাকটিভ থাইরয়েড বলা হয়।

কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ সাধারণত ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। অনেক সময় কয়েক মাস বা কয়েক বছর ধরেও এগুলো বাড়তে থাকে।

সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে

  • সব সময় ক্লান্ত লাগা
  • ঠান্ডা বেশি অনুভব করা
  • ওজন বেড়ে যাওয়া
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
  • মুখ ফোলা ফোলা লাগা
  • কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে যাওয়া
  • চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা ঝরে পড়া
  • পেশিতে ব্যথা বা দুর্বলতা
  • হৃদ্‌স্পন্দন ধীর হয়ে যাওয়া
  • বিষণ্নতা
  • মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির সমস্যা
  • নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক অনিয়মিত হওয়া বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়া

কেন এই সমস্যা হয়

হাইপোথাইরয়েডিজমের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলো হাশিমোটো রোগ, যা একটি অটোইমিউন রোগ। এ ক্ষেত্রে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে থাইরয়েড গ্রন্থির ওপর আক্রমণ করে।

এ ছাড়া আরও কিছু কারণ রয়েছে। যেমন-

  • থাইরয়েডের অস্ত্রোপচার
  • মাথা বা গলায় রেডিয়েশন থেরাপি
  • থাইরয়েডে প্রদাহ
  • কিছু ওষুধ, যেমন লিথিয়াম বা অ্যামিওডারোন
  • আয়োডিনের ঘাটতি বা অতিরিক্ত আয়োডিন
  • জন্মগত থাইরয়েড সমস্যা
  • পিটুইটারি গ্রন্থির কিছু রোগ
  • গর্ভাবস্থায় বা সন্তান জন্মের পর কিছু ক্ষেত্রে থাইরয়েডের সমস্যা

কারা বেশি ঝুঁকিতে

কিছু মানুষের মধ্যে এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

  • নারীদের
  • ৬০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি
  • পরিবারের কারও থাইরয়েড রোগ থাকলে
  • টাইপ ১ ডায়াবেটিস বা সিলিয়াক রোগের মতো অটোইমিউন রোগ থাকলে
  • আগে থাইরয়েডের চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে
  • গলা বা বুকে রেডিয়েশন থেরাপি নেওয়া থাকলে


চিকিৎসা না করলে কী হতে পারে?

হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা না করলে সময়ের সঙ্গে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।

এর মধ্যে রয়েছে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, গলগণ্ড বা থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া, স্নায়ুর ক্ষতি, সন্তান ধারণে সমস্যা, গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর বিভিন্ন জটিলতা এবং বিরল ক্ষেত্রে মিক্সিডিমা কোমা, যা জীবনহানিকর হতে পারে।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

শুধু লক্ষণ দেখে হাইপোথাইরয়েডিজম নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসক সাধারণত রক্ত পরীক্ষা করে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন বা টিএসএইচ এবং টি-৪ হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই রোগ নির্ণয় করা হয়।

চিকিৎসা কী?

হাইপোথাইরয়েডিজমের সবচেয়ে প্রচলিত চিকিৎসা হলো থাইরয়েড হরমোন প্রতিস্থাপনকারী ওষুধ, যেমন লেভোথাইরক্সিন। সঠিক মাত্রায় ওষুধ নিয়মিত সেবন করলে বেশির ভাগ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের মাত্রা কমানো বা বাড়ানো উচিত নয়। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করে ওষুধের ডোজ প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয় করা হয়।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিচের লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন ধরে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

  • কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত ক্লান্তি
  • দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া
  • ঠান্ডা বেশি লাগা
  • দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য
  • ত্বক ও চুলের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন
  • মাসিকের অস্বাভাবিক পরিবর্তন
  • স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগ কমে যাওয়া

হাইপোথাইরয়েডিজম একটি সাধারণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা। শুরুতে এর লক্ষণগুলো সাধারণ মনে হলেও অবহেলা করলে হৃদ্‌রোগ, বন্ধ্যাত্বসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে সময়মতো রোগ শনাক্ত করে নিয়মিত চিকিৎসা নিলে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে বেশির ভাগ মানুষ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

সূত্র: মায়ো ক্লিনিক