Advertisement

‘টাকা না নিয়ে ৩৭ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি করেছি’

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
‘টাকা না নিয়ে ৩৭ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি করেছি’
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত নাম ইকবাল বাহার জাহিদ। একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজারের পদ ছেড়ে ‘চাকরি করব না, চাকরি দেব’ দর্শনকে সামনে রেখে তিনি উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছেন। দায়িত্ব পালন করছেন অপটিম্যাক্স কমিউনিকেশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), আলাদিন ডটকমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং নিজের বলার মতো একটা গল্প ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে। টানা ৩১০৫ দিন বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বর্তমানে তার এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ছাড়িয়ে বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে বিস্তৃত। এ পর্যন্ত ৩৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থী এবং দেড় লাখের বেশি উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখার দাবি করে তার প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ব্যবসাবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘বিয়ন্ড বিজনেস’-এ অতিথি হয়ে উদ্যোক্তা তৈরির গল্প, নেতৃত্ব, কর্মসংস্থান, ব্যবসা এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন রিয়াজুল করিম। সম্পাদনা করেছেন জায়েদ আল মাহবুব

এশিয়া পোস্ট: আপনার শৈশবের কথা দিয়ে শুরু করি। স্কুলজীবনের কোন স্মৃতি বেশি মনে পড়ে?

ইকবাল বাহার: আমার শৈশব কেটেছে ফেনী জেলার ফুলগাজীর একটি গ্রামে। আমাদের স্কুলজীবন ছিল খুবই আনন্দময়। আমরা যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি, যেখানে পারিবারিক অনুশাসন ছিল বেশ কঠোর। সন্ধ্যায় আজান হলেই পড়তে বসতে হতো। আবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই মক্তবে আরবি পড়তে যেতে হতো। মক্তব থেকে ফিরে দলবেঁধে পুকুরে গোসল করতাম, তারপর খেয়ে স্কুলে যেতাম। স্কুল থেকে ফিরে শুরু হতো খেলাধুলা। আমাদের সময়ের সেই শৈশব ছিল সত্যিই অসাধারণ, যা বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের জীবনে খুব একটা দেখা যায় না।

এশিয়া পোস্ট: সেই সময়ে কি আপনার মাথায় এসেছিল ভবিষ্যতে আপনি ব্যবসা করবেন?

ইকবাল বাহার: সত্যি বলতে, তখন আমরা নিজেরা খুব একটা বড় স্বপ্ন দেখতাম না। আমাদের হয়ে স্বপ্ন দেখতেন বাবা-মায়েরা। আমার বাবার খুব ইচ্ছা ছিল আমি ইঞ্জিনিয়ার হই। তাই ধীরে ধীরে সেটিই আমার লক্ষ্য হয়ে ওঠে। নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই এবং ভালো ফল করে এসএসসি পাস করি। আমাদের পরিবারে একটি ঐতিহ্য ছিল, এসএসসির পর ছেলে-মেয়ে সবাই উচ্চমাধ্যমিক পড়ার জন্য ঢাকায় চলে আসবে। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালে আমি ঢাকায় এসে তিতুমীর কলেজে ভর্তি হই। চাচাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে থাকতাম। ঢাকায় এসে স্বাধীনতার স্বাদ পেলাম, অভিভাবকের সরাসরি শাসনও ছিল না। ফলে পড়াশোনায় কিছুটা অমনোযোগী হয়ে পড়ি। সেই সময় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ি।

এশিয়া পোস্ট: এরপরের সময়টা আপনার জন্য কেমন ছিল?

ইকবাল বাহার: ইন্টারমিডিয়েটে আমি অকৃতকার্য হই। তখন মনে হয়েছিল, জীবন যেন থমকে গেছে। এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলাম যে, বাসা থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলাম। ঠিক সেই সময় বাবা আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘তুমি ব্যর্থ হওয়ার মতো ছাত্র নও। নতুন করে শুরু করো।’ বাবার এই একটি কথাই আমাকে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছিল। কিন্তু এসএসসি ও ইন্টারমিডিয়েটের ফলাফলের কারণে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। এমনকি কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাইনি। সেই ব্যর্থতার সময়ে অনেক বন্ধু ও আত্মীয়ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অনেকে বলেছিল, আমার জীবন শেষ। কোনো স্কুলে শিক্ষকতা করেই আমাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: এই ব্যর্থতা আপনার জীবনে কেমন প্রভাব ফেলেছিল এবং আপনি কীভাবে সেই কঠিন সময় পার করেছেন?

ইকবাল বাহার: চারপাশের মানুষের বিরূপ মন্তব্যে আমি যেন হঠাৎ করেই অনেক বেশি পরিণত হয়ে উঠেছিলাম। আমি লক্ষ্য পরিবর্তন করে তিতুমীর কলেজে বি.কমে (পাস কোর্স) ভর্তি হলাম। দ্রুত পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের এক ধরনের তাগিদ অনুভব করছিলাম। বি.কম পরীক্ষার সময়ই কাজের সন্ধানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করি। কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে প্রায় সব জায়গা থেকেই নিরাশ হতে হয়। ইন্টারমিডিয়েটে অকৃতকার্য হওয়ায় কেউ আমাকে চাকরি দিতে রাজি ছিল না। শেষ পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বললাম, ‘আমার বেতন লাগবে না, আমি শুধু কাজ শিখতে চাই।’ ১৯ বছর বয়সি এক তরুণের এমন আগ্রহ দেখে তারা অবাক হয়েছিলেন এবং আমাকে সুযোগ দিয়েছিলেন। সেখানে আমি টানা ছয় মাস বিনা বেতনে কাজ শিখেছি।

এশিয়া পোস্ট: আপনার কর্মজীবনের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?

ইকবাল বাহার: বি.কম সম্পন্ন করার পর আমি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি (সিএ) কোর্সে ভর্তি হই। সিএ শুরু করার পর থেকেই আমার জীবন নতুন মোড় নিতে থাকে। কোর্স শেষ করার পর একটি আইটি প্রতিষ্ঠানে ফাইন্যান্স বিভাগে কাজ শুরু করি। সেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময়ই আমার মাথায় প্রথম উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দানা বাঁধে।

ফাইন্যান্সের দায়িত্বে থাকলেও সেলস, মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং এবং কাস্টমার কেয়ারের কাজের প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। তখন বুঝতে পারলাম, চাকরি করে এসব ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়া সম্ভব নয়, নিজের একটি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। এরপর আরও একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি এবং একপর্যায়ে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে যোগ দিই। সেখানে সততা, দক্ষতা ও কঠোর পরিশ্রমের কারণে খুব দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্ব পর্যন্ত পৌঁছে যাই।

এশিয়া পোস্ট: জেনারেল ম্যানেজার পদে পৌঁছাতে কত সময় লেগেছিল এবং সেই সফলতার পর আপনার পরবর্তী পরিকল্পনা কী ছিল?

ইকবাল বাহার: মাত্র তিন বছর লেগেছিল জেনারেল ম্যানেজার হতে। এই সময়ের মধ্যেই চাকরিতে থাকা অবস্থায় কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ‘অপটিম্যাক্স’ প্রতিষ্ঠা করি। ২০০৩ সালে শুরু করার পর একই সঙ্গে চাকরি ও ব্যবসা চালিয়ে যেতাম। সকাল সাড়ে আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত অফিস করতাম, এরপর রাত দশটা পর্যন্ত ব্যবসার কাজ করতাম। শুক্র ও শনিবার প্রায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা সময় দিতাম।

কিন্তু একসময় বুঝতে পারলাম, দুই দিক একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তখন চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই। সেই সময় কোম্পানি খুব স্ট্রাগলের মধ্যে ছিল। অফিস ভাড়া বা কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থও ছিল না। কোম্পানি টিকবে কি না, সেটাও নিশ্চিত ছিলাম না। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতেই আমি চাকরি ছেড়ে পূর্ণসময় ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

এশিয়া পোস্ট: অপটিম্যাক্সের শুরুর দিকে আপনারা কী নিয়ে কাজ করতেন?

ইকবাল বাহার: আমরা ইন্টারনেট কোম্পানি হিসেবে সেকেন্ড জেনারেশন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট শুরু করি। তখন আমাদের কোনো ব্র্যান্ড বা লোগো ছিল না। একেবারেই শূন্য থেকে শুরু করেছি। প্রথম দুই বছর ভয়ানক স্ট্রাগল করার পর ফুলটাইম সময় দেওয়ায় এক বছরের মধ্যেই ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ায়। আজ সেই প্রতিষ্ঠানের বয়স ২৪ বছর।

যখন নিজের একটি অবস্থান তৈরি হলো, তখন মনে হলো, নিজের জন্য তো করলাম, কিন্তু মানুষের জন্য কী করলাম? এই ভাবনা থেকেই মূলত ‘নিজের বলার মতো একটা গল্প’ প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু। আমি দেখলাম, বেকারত্ব এবং দক্ষতার অভাব আমাদের দেশের বড় সমস্যা। সার্টিফিকেট থাকলেও অনেক তরুণের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। তাই আমার ১৫ বছরের উদ্যোক্তা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের শেখানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি ব্যতিক্রম কিছু করতে চেয়েছিলাম।

এশিয়া পোস্ট: এর আগে কি আপনার প্রশিক্ষণ দেওয়ার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল?

ইকবাল বাহার: না, এর আগে আমি শুধু আমার উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পগুলো শোনাতাম। পরে মনে হলো, শুধু স্বপ্ন দেখালে হবে না, স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথও দেখাতে হবে। সেজন্য আমি প্রতিদিন শেখানোর সিদ্ধান্ত নিই এবং ঠিক করি, এর জন্য কোনো টাকা নেব না।

২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে অনলাইনে প্রশিক্ষণ শুরু করি। টানা ৯০ দিনের একেকটি ব্যাচে আমি প্রশিক্ষণ দিই। এ পর্যন্ত আমি ১ হাজার ৭০০টি ভিডিও এবং পাঁচটি বই তৈরি করেছি। এটি একটি প্রফেশনাল স্ট্রাকচার্ড ট্রেনিং, যার বাজারমূল্য কমপক্ষে ২ লাখ টাকা।

এশিয়া পোস্ট: এত সময় ও শ্রম দিয়েও একেবারে বিনামূল্যে এই শিক্ষা দেওয়ার মূল কারণ কী?

ইকবাল বাহার: আমার মাথায় সবসময় বাংলাদেশ শব্দটি ছিল এবং আমি দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছি। আমি হয়তো বিশাল বড় কেউ নই, কিন্তু একজন মাঝারি মানের উদ্যোক্তা হিসেবে আমার জ্ঞান বিতরণ করতে পারি। এখানে আমার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলো সময়।

প্রতিদিন আমি চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় দিই। আমি ৬৪ জেলা ঘুরেছি, বিদেশে প্রবাসীদের কাছে গিয়েছি। আমার সঙ্গে যারা কাজ করছে, তারা সবাই ভলান্টিয়ার। ভলান্টিয়ারিংয়ের মাধ্যমে কীভাবে উদ্যোক্তা হওয়া যায় এবং এতে কীভাবে লিডারশিপ, নেটওয়ার্কিং ও কমিউনিকেশন স্কিল তৈরি হয়, সেটিই আমি তাদের শিখিয়েছি। প্রথম ব্যাচে ১৬৪ জন নিয়ে শুরু করেছিলাম, এখন আমার শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৭ লাখ।

এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে আপনাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কীভাবে চলছে?

ইকবাল বাহার: এখন প্রত্যেক ব্যাচে প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী যুক্ত হয়। আমার কনটেন্ট প্রতি মাসে ১০ কোটিরও বেশি ভিউ হয়। এটি একটি ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। কারণ, টানা ৩১০৫ দিন আমি এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। অসুস্থ থাকলেও বা বিদেশে থাকলেও আমি এটি এক দিনের জন্যও বন্ধ করিনি। অনেকে আমাকে টাকা দেওয়ার অফার করেছেন। প্রতি ব্যাচ থেকে কোটি কোটি টাকা আয়ের সুযোগ ছিল। কিন্তু মানুষের জন্য কাজ করার যে নিয়ত করেছি, আমি সেই জায়গাতেই থাকতে চাই।

এশিয়া পোস্ট: আপনি যেভাবে সময় ও মেধা ব্যয় করছেন, তা তো আপনার নিজের ব্যবসার ক্ষতি করতে পারত। এই ট্রেড-অব বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ইকবাল বাহার: হয়তো আমি আরও অনেক টাকা কামাতে পারতাম। কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কত টাকা লাগে? মনের শান্তির জন্য কিছু কাজ করা দরকার, যা নিজেকে প্রশান্তি দেয়। আমি বিগত সাড়ে আট বছরে প্রায় ৫ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করতে পেরেছি, যা আমার ২৪ বছরের ব্যবসায় সম্ভব ছিল না। এটার আউটপুট অনেক বড়। মানুষের জীবন পরিবর্তন হচ্ছে, তারা মানবিক ও ইতিবাচক হচ্ছে।

এশিয়া পোস্ট: নতুন উদ্যোক্তারা ব্যবসায়িক প্রতিকূলতার সময় আপনাদের সাপোর্ট পায় কীভাবে?

ইকবাল বাহার: আমি এটাকে বিকেন্দ্রীকরণ করে দিয়েছি। ৬৪ জেলা, ৪৯২টি উপজেলা এবং বিশ্বের ৫০টি দেশে আমাদের টিম আছে। আমরা একটি প্যারালাল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছি। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অনলাইন মিটাআপে অভিজ্ঞ উদ্যোক্তারা নতুনদের সমস্যার সমাধান ও গাইড প্রদান করেন। এভাবে আমরা সম্মিলিতভাবে সবাইকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি।

এশিয়া পোস্ট: অনলাইনে চড়া মূল্যে অনেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার কোর্স বিক্রি করেন। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

ইকবাল বাহার: কেউ যদি টাকা নিয়ে কোর্স করান, সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। আমি দেশের জন্য কাজ করি এবং এটাকে বিজনেস হিসেবে দেখি না। যারা লাখ লাখ টাকা দিয়ে ট্রেনিং করছেন, তাদের বলব, মেন্টরের প্রোফাইল ও ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করতে। তিনি নিজে ব্যবসায় কতটা সফল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। শেখার জন্য টাকা খরচ করা ঠিক আছে, কিন্তু শুধু মোটিভেশনের জন্য এত টাকা দেওয়া উচিত নয়।


এশিয়া পোস্ট:
আপনার প্ল্যাটফর্ম থেকে যারা কোর্স করেছেন, তাদের সফলতার কোনো উদাহরণ কি দিতে পারেন?

ইকবাল বাহার: রবিউল নামে আমার প্রথম ব্যাচের একজন বেকার ছাত্র ছিল। সে মাত্র ৫ হাজার টাকা নিয়ে ফুটপাতে প্যান্টের ব্যবসা শুরু করে। আজ সে একটি গার্মেন্টসের মালিক এবং মাসে কয়েক কোটি টাকা বিক্রি করে। সে প্রথম গাড়ি কেনার পর আমাকে সেই গাড়িতে চড়িয়েছিল। কারণ, আমি তাকে পথ দেখিয়েছিলাম।

এমন হাজারো সফলতার গল্প রয়েছে। আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে গেলে এসব দেখতে পাবেন।

এশিয়া পোস্ট: নারীদের ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে আপনারা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন?

ইকবাল বাহার: আমরা আমাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমাদের কনটেন্টগুলো খুব সহজভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে স্বশিক্ষিত থেকে শুরু করে পিএইচডি করা শিক্ষার্থী, সবাই সহজেই বুঝতে পারে। আমাদের একটি ‘অনলাইন হাট’ বা মার্কেটপ্লেস রয়েছে, যেখানে আমাদের উদ্যোক্তারাই ক্রেতা এবং তারাই বিক্রেতা। এতে তাদের বিক্রির সমস্যারও সমাধান হচ্ছে। আমরা নারীদের আত্মপরিচয় তৈরি করছি এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের নৈতিকতার ওপর জোর দিচ্ছি, যাতে কেউ প্রতারিত না হয়।

এশিয়া পোস্ট: নতুন কেউ আপনাদের সঙ্গে যুক্ত হতে চাইলে করণীয় কী?

ইকবাল বাহার: ফেসবুক গ্রুপ, পেজ বা ইউটিউবে যুক্ত হয়েই প্রশিক্ষণ নেওয়া যায়। জেলাভিত্তিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে তারা নিজেদের ব্র্যান্ডিং করতে পারে। এমনকি জামালপুরে বসে কেউ সৌদি আরবের বাজারে নিজের পণ্য প্রদর্শন করতে পারে, আমরা সেই ব্যবস্থাও করেছি। আমি সবসময় ছোট থেকে শুরু করার পরামর্শ দিই। কারণ, এতে ক্ষতির ঝুঁকি কম থাকে। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার কোনো উপায় আমি বিশ্বাস করি না। সফল হতে হলে পরিশ্রম করতেই হবে।

এশিয়া পোস্ট: তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যহীনতা বা অলসতা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

ইকবাল বাহার: এই জায়গায় আমি তরুণদের দোষ দিতে চাই না। এর দায়ভার আমাদের। কারণ, আমরা তাদের সঠিক পথ দেখাতে পারছি না। আমি অনেক তরুণের মধ্যে অসীম সম্ভাবনা দেখেছি। তরুণদের জন্য আমার চারটি প্রধান পরামর্শ রয়েছে। প্রথমত, স্বপ্ন দেখুন এবং সেই স্বপ্নের কথা লিখে চোখের সামনে রাখুন। দ্বিতীয়ত, সাহস করুন। সাহস আসে জ্ঞান, প্রশিক্ষণ এবং ভালো সার্কেল থেকে। তৃতীয়ত, শুরু করুন। মানুষ কী ভাবছে, সেটা নিয়ে চিন্তা করবেন না। কারণ, আপনি সফল হলে এই মানুষগুলোই আপনার প্রশংসা করবে। চতুর্থত, লেগে থাকুন। শর্টকাটে কিছু হয় না। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার পরিশ্রম আপনাকেই করতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: অনেক উদ্যোক্তাই একসঙ্গে একাধিক ব্যবসা শুরু করতে চান। এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

ইকবাল বাহার: বিষয়টি অনেকটা বিমান চালানোর মতো। ওড়ার আগে যেমন দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নিয়ে একজন দক্ষ পাইলট হতে হয়, ব্যবসার ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমনই। প্রথমে একটি ব্যবসায় নিজের অবস্থান মজবুত করুন। যখন দেখবেন আপনি সেই ব্যবসাটি সফলভাবে পরিচালনা করতে পারছেন, তখনই অন্য প্রকল্পে হাত দেওয়া উচিত। এর আগে একাধিক ব্যবসায় জড়ানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বড় শিল্প গ্রুপগুলোর দিকেও যদি তাকান, দেখবেন তারাও অনেক সময় পরিস্থিতি বা নীতিগত পরিবর্তনের কারণে বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে। তাই একজন উদ্যোক্তার জন্য শুরুতে একটি ব্যবসায় পূর্ণ মনোযোগ দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

এশিয়া পোস্ট: এসএমই খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে মনে করেন?

ইকবাল বাহার: এসএমই খাত বা ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলো আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। অথচ যখন কোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন এই খাতের উদ্যোক্তাদের কথা খুব একটা গুরুত্ব পায় না। বড় বড় শিল্পপতিদের সঙ্গে সরকার আলোচনা করে, কিন্তু দিনশেষে ছোট উদ্যোক্তারা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হন, তা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ বা এক জায়গায় সব সেবা পাওয়ার কথা আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছি, কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন খুব কম। একটি ট্রেড লাইসেন্স করতেও একজন নতুন উদ্যোক্তাকে মাসের পর মাস বিভিন্ন অফিসে দৌড়াতে হয়, নানা ধরনের হয়রানি সহ্য করতে হয়। এই ভোগান্তিটা খুব কম মানুষই দেখে। আবার লোনের কথা যদি বলেন, জামানত ছাড়া লোন পাওয়া আমাদের দেশে এখন প্রায় অসম্ভব। কারও সুপারিশ ছাড়া এই লোন পাওয়ার প্রক্রিয়া এত জটিল যে অনেক উদ্যোক্তা হাল ছেড়ে দেন।

আমার মনে হয়, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে সরকারকে শুধু বড় শিল্পের দিকে তাকালে হবে না। এসএমই খাতের জন্য সুযোগ তৈরি করতে হবে। এসএমইবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারলে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

এশিয়া পোস্ট: তরুণদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?

ইকবাল বাহার: তরুণদের বলব, শুধু ডিগ্রি বা সার্টিফিকেটের পেছনে দৌড়াবেন না। আসল যোগ্যতা হলো আপনার কাজের দক্ষতা। শুধু কাগজ-কলমের সার্টিফিকেট দিয়ে বেশি দূর যাওয়া সম্ভব নয়, যদি না আপনি হাতে-কলমে কাজটা জানেন। শর্টকাটে ধনী হওয়ার বা বড় হওয়ার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন।

ধৈর্য ধরে নিজেকে সময় দিন, নতুন নতুন কাজ শিখুন। সততা ও পরিশ্রমকে সঙ্গী করে সামনে এগিয়ে যান। এক দিন দেখবেন, আপনি নিজেই নিজের একটি পরিচয় বা ব্র্যান্ড তৈরি করে ফেলেছেন। আর একবার সেই জায়গাটা তৈরি হয়ে গেলে, কাজ আপনাকে খুঁজে নেবে।