দিনের শুরুতেই পুষ্টি পেতে নাশতায় রাখুন এই খাবারগুলো

সকালের নাশতা কেমন হবে, তার ওপর দিনের শুরুটা অনেকটাই নির্ভর করে। সকালে শুধু পেট ভরানোর জন্য কিছু খেলেই যে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাবে, তা নয়। নাশতায় এমন খাবার রাখা দরকার, যাতে প্রোটিন, ফাইবার, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন ও খনিজের সমন্বয় থাকে। এতে দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে এবং দিনের শুরুতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দিতে সাহায্য করতে পারে।
পুষ্টিবিদদের মতে, ডিম, ওটস, দই, বাদাম, ফল ও সম্পূর্ণ শস্যের মতো খাবার সকালের নাশতায় ভালো বিকল্প হতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি, পরিশোধিত শস্য ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিমাণ কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
ডিম
ডিম সকালের নাশতায় প্রোটিনের সহজ উৎস। প্রোটিন তুলনামূলক দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। ডিমের সঙ্গে আটার রুটি, ওটস বা সবজি যোগ করলে নাশতাটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।

সিদ্ধ, পোচ বা অল্প তেলে ভাজা ডিম খেতে পারেন। তবে ডিমের সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার অভ্যাস না করাই ভালো।
দই
দই সাধারণ দইয়ের তুলনায় বেশি প্রোটিনসমৃদ্ধ হতে পারে। এতে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি১২, জিংক ও পটাশিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদানও থাকে।

সকালে প্লেইন গ্রিক দইয়ের সঙ্গে কলা, পেয়ারা, আপেল বা অন্যান্য ফল এবং সামান্য বাদাম যোগ করে খেতে পারেন। চিনি দেওয়া ফ্লেভারযুক্ত দইয়ের বদলে প্লেইন দই বেছে নেওয়া ভালো।
কফি
অনেকের সকাল শুরু হয় এক কাপ কফি দিয়ে। কফিতে থাকা ক্যাফেইন সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। এতে পলিফেনলও রয়েছে, যেগুলোর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
তবে কফিতে অতিরিক্ত চিনি, ফ্লেভারযুক্ত সিরাপ বা বেশি ক্রিম যোগ করলে পানীয়টির ক্যালরি অনেক বেড়ে যেতে পারে। তাই সম্ভব হলে কম চিনি বা চিনি ছাড়া কফি পান করা ভালো।
-3b3c4b.jpg)
ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা ব্যক্তিভেদে আলাদা। তাই বেশি কফি পান করে অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা ঘুমের সমস্যা হলে পরিমাণ কমানো উচিত।
ওটস
সকালের নাশতায় ওটস বেশ ভালো একটি বিকল্প। এতে বিটা-গ্লুকান নামের দ্রবণীয় ফাইবার থাকে। এই ফাইবার পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং কোলেস্টেরল ও রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।

ওটসের সঙ্গে দুধ বা টক দই, কলা, আপেল, বাদাম ও চিয়া সিড যোগ করলে প্রোটিন ও ফাইবারের পরিমাণ বাড়ানো যায়। অতিরিক্ত চিনি দিয়ে ওটস খাওয়ার বদলে ফল দিয়ে মিষ্টি স্বাদ আনা ভালো।
চিয়া সিড
চিয়া সিডে প্রচুর ফাইবার থাকে। পানি শোষণ করে এটি ফুলে যায়, ফলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি দিতে পারে।

চিয়া সিড দই, ওটস বা দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যায়। তবে একসঙ্গে বেশি পরিমাণে না খেয়ে অল্প দিয়ে শুরু করা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা ভালো।
বেরি জাতীয় ফল
স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, রাস্পবেরি বা ব্ল্যাকবেরির মতো বেরি জাতীয় ফলে ফাইবার ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এগুলো ওটস, দই বা স্মুদির সঙ্গে খাওয়া যায়।

বাংলাদেশে সব ধরনের বেরি সহজে পাওয়া যায় না। তাই একই ধরনের পুষ্টি পাওয়ার জন্য স্থানীয় মৌসুমি ফল যেমন পেয়ারা, কমলা, পেঁপে বা অন্যান্য ফলও নাশতায় রাখা যেতে পারে।
কটেজ চিজ/ ছানা
কটেজ চিজে তুলনামূলক বেশি প্রোটিন থাকে। তাই যারা সকালে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেতে চান, তাদের জন্য এটি একটি বিকল্প হতে পারে।

তবে কিছু কটেজ চিজে সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগের সমস্যা থাকলে কম সোডিয়ামযুক্ত পণ্য বেছে নেওয়া ভালো।
শস্যের রুটি
সাদা পাউরুটির বদলে বিভিন্ন শস্যের রুটি বেছে নেওয়া যেতে পারে। এতে ফাইবার বেশি থাকতে পারে এবং পরিশোধিত সাদা রুটির তুলনায় হজম ধীরে হতে পারে।

রুটির সঙ্গে ডিম, বাদামের মাখন, অ্যাভোকাডো, দই বা সবজি যোগ করলে নাশতায় প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বিও যুক্ত হবে। সম্পূর্ণ শস্যকে পরিশোধিত শস্যের তুলনায় ভালো কার্বোহাইড্রেটের উৎস হিসেবে ধরা হয়।
বাদাম
কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, আখরোট বা চিনাবাদামে প্রোটিন, ফাইবার, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম ও অসম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে।

সকালে ওটস বা দইয়ের সঙ্গে এক মুঠো বাদাম খাওয়া যায়। তবে বাদামে ক্যালরি বেশি হওয়ায় পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। লবণ বা চিনি মেশানো বাদামের বদলে সাধারণ বাদাম বেছে নেওয়া ভালো।
গ্রিন টি
কফির তুলনায় গ্রিন টিতে সাধারণত ক্যাফেইন কম থাকে। এতে এল-থিয়ানিন ও বিভিন্ন পলিফেনলও রয়েছে।

তবে গ্রিন টি কোনো জাদুকরী স্বাস্থ্যকর পানীয় নয়। শুধু ওজন কমানো বা কোনো রোগ প্রতিরোধের আশায় অতিরিক্ত গ্রিন টি পান করার প্রয়োজন নেই। চায়ে অতিরিক্ত চিনি না দেওয়াই ভালো।
প্রোটিন শেক ও স্মুদি
সকালে সময় কম থাকলে স্মুদি সহজ বিকল্প হতে পারে। দুধ বা টক দইয়ের সঙ্গে কলা, পেয়ারা, বেরি বা অন্য ফল এবং বাদাম বা বীজ মিশিয়ে তৈরি করা যায়।

প্রোটিনের প্রয়োজন বেশি হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রোটিন পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বাজারের তৈরি স্মুদিতে অতিরিক্ত চিনি থাকতে পারে, তাই উপকরণ নিজে নিয়ন্ত্রণ করে তৈরি করা ভালো।
আস্ত ফল
সকালের নাশতায় কলা, পেয়ারা, কমলা, পেঁপে, আপেল বা অন্য কোনো মৌসুমি ফল রাখা যায়। ফলে ফাইবার, ভিটামিন, খনিজ ও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান পাওয়া যায়।

ফলের জুসের বদলে আস্ত ফল খাওয়াই ভালো। কারণ আস্ত ফলে ফাইবার থাকে, যা ফলের প্রাকৃতিক চিনি শরীরে শোষণের গতি ধীর করতে সাহায্য করে।
শুধু একটি খাবার নয়, নাশতা হোক ভারসাম্যপূর্ণ
সকালে শুধু ডিম, শুধু ফল বা শুধু ওটস খাওয়াই সবচেয়ে ভালো নাশতা এমন নয়। বরং কয়েক ধরনের পুষ্টিকর খাবার একসঙ্গে রাখলে নাশতা আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।
যেমন, ডিমের সঙ্গে আটার রুটি ও পেয়ারা, অথবা ওটসের সঙ্গে দই, কলা ও বাদাম খাওয়া যেতে পারে। Harvard-এর পুষ্টি নির্দেশনায় সকালের খাবারে প্রোটিন, ফাইবারসমৃদ্ধ কার্বোহাইড্রেট এবং ফল বা সবজি রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সকালে কোন খাবার কম খাবেন?
সকালের নাশতায় অতিরিক্ত চিনি, পরিশোধিত ময়দা ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস কমানো ভালো। মিষ্টি সিরিয়াল, পেস্ট্রি, ডোনাট, সাদা পাউরুটি এবং অতিরিক্ত চিনি দেওয়া পানীয় দ্রুত ক্যালরি যোগ করতে পারে, কিন্তু তুলনামূলক কম ফাইবার ও পুষ্টি দিতে পারে।
প্রক্রিয়াজাত মাংস যেমন বেকন বা সসেজেও সোডিয়াম ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকতে পারে। তাই এগুলো নিয়মিত সকালের খাবার হিসেবে না রাখাই ভালো।

সকালের নাশতা স্বাস্থ্যকর করতে খুব দামি বা বিশেষ কোনো খাবারের প্রয়োজন নেই। ডিম, ওটস, দই, বাদাম, ফল, চিয়া সিড ও সম্পূর্ণ শস্যের মতো সহজলভ্য খাবার দিয়েই পুষ্টিকর নাশতা তৈরি করা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একসঙ্গে প্রোটিন, ফাইবার, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং ফল বা সবজির সমন্বয় করা। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর নাশতার প্রয়োজনও বদলাতে পারে। তাই সবার জন্য একই খাবার বা একই পরিমাণ উপযুক্ত নয়।
সূত্র: হেল্থলাইন