বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস আজ, বাংলাদেশিরা কতটা দক্ষ

  • প্রশিক্ষণের অভাবে অদক্ষই থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশের তরুণরা
  • দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই তরুণ
  • কারিগরি প্রতিষ্ঠানে অর্ধেকের বেশি শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের পদ শূন্য
বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস আজ, বাংলাদেশিরা কতটা দক্ষ
ছবি: সংগৃহীত

আজ ১৫ জুলাই বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল দক্ষতার মাধ্যমে যুব ক্ষমতায়ন’। বাংলাদেশেও দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি তরুণ—যা দেশের জন্য বড় সম্ভাবনার বিষয়। কিন্তু দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করলে সেই আশাবাদ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।

তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষই ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ বলছে, দেশের ১১ কোটি ৭১ লাখ কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি মানুষ কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছে।

একই জরিপে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৬৮ লাখ। এর মধ্যে ১৯ লাখ ৪০ হাজার তরুণ বেকার, যা এ বয়সি জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশে মোট বেকারের প্রায় ৭৯ শতাংশ এই বয়সসীমার অন্তর্ভুক্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের বড় সম্ভাবনা তৈরি করলেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ সুবিধার অভাবে তাদের বড় অংশ অদক্ষই থেকে যাচ্ছে।

বিদেশের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে দেশে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) এবং ৬টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে ৫৫টি ট্রেডে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২০২২–২৩ অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠানে ১১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বিদেশগামী বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রায় ৯০ শতাংশ পেশা সংশ্লিষ্ট কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যান।

টিটিসি ও আইএমটিতে অর্ধেকের বেশি প্রশিক্ষকের পদ শূন্য

দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সরকারের প্রধান প্রতিষ্ঠান বিএমইটি দীর্ঘদিন ধরে চরম প্রশিক্ষক সংকটে ভুগছে। সরকারি তথ্য বলছে, বিএমইটির অধীন টিটিসি ও ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজিতে বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষক ও কারিগরি শিক্ষকের পদ বছরের পর বছর শূন্য থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত মানের প্রশিক্ষণ দিতে পারছে না।

বিএমইটির ২০২২ সালের জনবল তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে ২ হাজার ৫০০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন মাত্র ১ হাজার ১৬৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। ফলে ১ হাজার ৩৩২টি পদ শূন্য ছিল, যা মোট পদের ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি পদ শূন্য থাকায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় ধরনের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি সংকট রয়েছে সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর পদে। ডিপ্লোমা ও নন-ডিপ্লোমা উভয় ধারায় ৫৪৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন মাত্র ১৯৮ জন। ফলে ৩৪৮টি পদ (৬৩.৭ শতাংশ) শূন্য ছিল।

ইন্সট্রাক্টর পদেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ৮৮৫টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত ছিলেন ৫৫৫ জন, ফলে ৩৩০টি পদ (৩৭.৩ শতাংশ) শূন্য ছিল।

বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষক সংকট আরও প্রকট। ২২৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে মাত্র ৩১ জন প্রশিক্ষক কর্মরত ছিলেন, ফলে ১৯৬টি পদ (৮৬.৩ শতাংশ) শূন্য ছিল।

টিটিসিগুলোর নেতৃত্ব পর্যায়েও রয়েছে বড় ধরনের সংকট। ৩০৬টি চিফ ইন্সট্রাক্টর পদের মধ্যে ১৭১টি এবং ৮১টি প্রিন্সিপাল পদের মধ্যে ৫১টি শূন্য ছিল। এসব পদের শূন্যতার হার যথাক্রমে ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ ও ৬৩ শতাংশ।

ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজিতেও একই চিত্র। ৪৩টি সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর পদের মধ্যে ৩০টি শূন্য ছিল, যা ৬৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া বিএমইটি ও আইএমটির ৮৫টি ইন্সট্রাক্টর পদের মধ্যে ৪১টি শূন্য ছিল।

সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট ছিল ক্রাফট ইন্সট্রাক্টর পদে। ৩০টি অনুমোদিত পদের মধ্যে মাত্র ২টি পূরণ হয়েছিল, অর্থাৎ ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ পদই শূন্য ছিল। অন্যদিকে আইএমটিতে বিজ্ঞান, গণিত ও কম্পিউটার বিষয়ের ১৫টি প্রশিক্ষক পদের মধ্যে ৬টি শূন্য ছিল।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনেও প্রশিক্ষক সংকটকে বিএমইটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নতুন প্রতিষ্ঠিত অনেক টিটিসিতে সরকার নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক না থাকায় সীমিতসংখ্যক আউটসোর্সিং প্রশিক্ষকের মাধ্যমে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এতে প্রশিক্ষণের মান ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হলে বিএমইটির প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা প্রশিক্ষক ও কারিগরি শিক্ষকের পদ দ্রুত পূরণ করাও জরুরি।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার বাণী

বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান র‌্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনারসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

এদিকে পরিকল্পনা কমিশনের জেনারেল ইকোনমিকস ডিভিশনের (জিইডি) নীতিপত্র ‘হারনেসিং দ্য পোটেনিশিয়ালস অব ইয়োথ’ আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ বর্তমানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নয়।

একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের বেকারত্বের হার ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক জরিপে দেখা গেছে, গত তিন বছরে বাংলাদেশের ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ এক দিনের জন্যও কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেননি। অথচ জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেকেরও বেশি জানিয়েছেন, তাদের চাকরি সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

এই দক্ষতার ঘাটতির কারণে অনেকে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—উভয় শ্রমবাজারেই উপযুক্ত কর্মসংস্থান পেতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতামত

এ বিষয়ে এশিয়া পোস্টকে দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়ার উপাচার্য অধ্যাপক ড. আসিফ মিজান বলেন, কারিকুলামের আমূল সংস্কার ও আন্তর্জাতিকীকরণ প্রয়োজন। শিক্ষাক্রমকে ‘আউটকাম-বেইজড এডুকেশন (ওবিই)’ মডেলে রূপান্তর করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স এবং ব্লকচেইনের মতো উদীয়মান প্রযুক্তির তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা উচ্চশিক্ষার প্রতিটি স্তরে বাধ্যতামূলক করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। ইন্টার্নশিপ, যৌথ গবেষণা এবং বাজারের চাহিদাভিত্তিক কারিকুলাম প্রণয়ন সম্প্রসারণ করলে দক্ষতার ঘাটতি কমবে এবং শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের কর্মবাজারের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হবে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি তরুণ—এটি জাতির জন্য বিরাট সৌভাগ্য। কিন্তু রাষ্ট্র যদি আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতায় তাদের প্রশিক্ষিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা সম্পদ নয়, বরং বোঝায় পরিণত হবে।

তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা থাকলেও আমরা পর্যাপ্ত দক্ষ কর্মী দিতে পারছি না। শেষ পর্যন্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বাধ্য হয়ে অদক্ষ শ্রমিক বিদেশে পাঠাচ্ছে, যা একটি জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

তিনি আরও বলেন, বিএমইটির প্রশিক্ষণ কোর্সগুলো সময়োপযোগী নয় এবং বর্তমান বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদাও পূরণ করতে পারছে না।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব-১ মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, টিটিসি ও আইএমটির অধিকাংশ শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের পদ বছরের পর বছর শূন্য পড়ে আছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া তরুণরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।

কর্মকর্তারা যা বলছেন

বিএমইটির মহাপরিচালক জামিল আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে পাঠানো খুদে বার্তারও কোনো উত্তর মেলেনি।

এ বিষয়ে বিএমইটির পরিসংখ্যান কর্মকর্তা এমডি. মাসুদ আনাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ২০২৫ সালে টিটিসি ও আইএমটিগুলোর জন্য প্রায় ২০ থেকে ২২ জন শিক্ষক ও প্রশিক্ষক যোগ দিয়েছেন।

যদিও তখন এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় দেড় হাজার পদ শূন্য ছিল।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২০১৪ সালের একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর ১৫ জুলাই বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির লক্ষ্য কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের (টিভিইটি) গুরুত্ব তুলে ধরা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং সবুজ অর্থনীতির দ্রুত প্রসারের প্রেক্ষাপটে ইউনেসকো-ইউনেভক ভবিষ্যৎ উপযোগী দক্ষতায় তরুণদের সজ্জিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।

ইউনেসকো-ইউনেভকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী দক্ষতার ঘাটতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৭ কোটি ৩০ লাখ শিশু ও তরুণ শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।

এছাড়া ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের প্রতি পাঁচজনের একজন কখনও কোনো আনুষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়নি।

অন্যদিকে বর্তমান বৈশ্বিক শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের দক্ষতা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ২২ শতাংশ কর্মীকে নতুন পেশায় স্থানান্তরিত হতে হবে অথবা নতুন ধরনের কাজের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে।