Advertisement

স্পেন-আর্জেন্টিনা ফাইনাল ম্যাচে প্রভাব ফেলতে পারে দাবানলের ধোঁয়া?

পরিস্থিতি ‘নিবিড়ভাবে’ পর্যবেক্ষণ করছেন বিশ্বকাপ আয়োজকেরা, গত শুক্রবার বৈঠকে বসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ও ফিফা প্রধান।

আলজাজিরা
স্পেন-আর্জেন্টিনা ফাইনাল ম্যাচে প্রভাব ফেলতে পারে দাবানলের ধোঁয়া?
কানাডার দাবানলের ধোঁয়ায় শনিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামকে ঘিরে ফেলে। ছবি: সংগৃহীত

কানাডা থেকে ধেয়ে আসা ঘন দাবানলের ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সি। এর ফলে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে অস্বাস্থ্যকর বায়ুমানের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রোববার (১৯ জুলাই) নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচটি এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

বাতাসের গতি দক্ষিণাভিমুখী থাকায় শুক্রবার (১৭ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিও ধোঁয়ার কবলে পড়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানকার বায়ুমান সূচকটি ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’ তালিকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে এসেছে। এই অবস্থায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া নাগরিকদের বাড়ির বাইরে সমস্ত ধরনের বহিরঙ্গন কর্মকাণ্ড পরিহার করার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন।

নিউইয়র্ক এবং প্রতিবেশী নিউ জার্সির উন্মুক্ত স্টেডিয়ামে রোববার ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমানে এই মহানগর এলাকার বায়ু সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য কিছুটা অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার কুয়াশার কারণে ম্যানহাটনের আকাশসীমা প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার তুলনায় অবশ্য শুক্রবার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে।

তবে বৈশ্বিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ার-এর তথ্য অনুযায়ী, ডেট্রয়েট ও শিকাগো শহরের বায়ুমান ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় এই দুটি শহরকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস (এনডব্লিউএস) বা জাতীয় আবহাওয়া পূর্বাভাসের আবহাওয়াবিদেরা সতর্ক করেছেন, রাতারাতি ধোঁয়া আরও ঘনীভূত হয়ে শনিবার সকাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। নিউ জার্সির মেডোল্যান্ডসের যে উন্মুক্ত স্টেডিয়ামে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে, তা মূলত এনএফএল-এর নিউইয়র্ক জায়ান্টস ও জেটসের হোম গ্রাউন্ড। ফাইনালে এই মাঠে প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মেসির জন্য সামনে আরও যেসব রেকর্ড অপেক্ষা করছে

দাবানলের কারণে সৃষ্টি হওয়া ধোঁয়া ও অস্বাস্থ্যকর বায়ুমান বিশ্বকাপ ফাইনালের জন্য আপাতত কোনো বড় হুমকি নয় বলে শুক্রবার নিশ্চিত করেছে ফিফা। এর আগে দিনের শুরুতে টুর্নামেন্ট আয়োজকেরা জানিয়েছিলেন, তারা পরিস্থিতি ‘নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন’।

হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। আমাদের একজন কর্মকর্তা ফিফা সদর দপ্তরে ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদারকি করছেন।’

এ ছাড়া শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

জাতীয় আবহাওয়া সার্ভিসের আবহাওয়াবিদ পিটার মুলিনাক্স ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, গ্রেট লেকসের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস উত্তর-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্রে আরও ধোঁয়া ঠেলে দিতে পারে। এর ফলে আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন থাকতে পারে। তবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিস্থিতির কিছু উন্নতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

মুলিনাক্স বলেন, ‘আজকে যদি ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হতো, তবে যতটা ক্ষতি হতো, আগামী রোববারের খেলায় তেমন মারাত্মক প্রভাব পড়বে না বলে আমি বিশ্বাস করি।’

অন্যদিকে ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বায়ুমান পূর্বাভাসকারী জোয়েল ড্রিসেন বলেন, ছুটির দিনে ঝড়বৃষ্টির পর দক্ষিণাঞ্চলে আরও ধোঁয়া প্রবেশ করবে কি না, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তিনি বলেন, ‘কিছু গাণিতিক মডেলের পূর্বাভাস ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আমাদের এখানে আরও ধোঁয়া নিচে নেমে আসতে পারে।’

চলতি বিশ্বকাপে আবহাওয়ার কারণে অন্যান্য ম্যাচও বিঘ্নিত হয়েছে। তবে সেগুলো দাবানলের ধোঁয়ার কারণে নয়। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মেক্সিকো ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার নকআউট ম্যাচটির সময় পরিবর্তনের গুজব রটেছিল।

পরে আয়োজকেরা এই বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ম্যাচটি যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে ঝোড়ো আবহাওয়ার কারণে ইকুয়েডরের বিপক্ষে মেক্সিকোর শেষ ৩২-এর ম্যাচটি প্রায় এক ঘণ্টা বিলম্বিত হয়েছিল।

জুলাইয়ের তীব্র দাবদাহের কারণে আবহাওয়াবিদেরা বিশ্বকাপের বেশ কিছু নকআউট ম্যাচের ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বড় অংশ জুড়ে একটি শক্তিশালী ‘হিট ডোম’ বা দাবদাহের বলয় তৈরি হওয়ায় উত্তপ্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

বেশ কয়েকটি আয়োজক শহরে তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহরগুলোতে বিপজ্জনক ধোঁয়া এড়াতে মানুষ বাইরে মাস্ক পরছেন। নিউইয়র্কের লাইব্রেরি ও রেলস্টেশনগুলোতে বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে। দাবানলের নিকটবর্তী হওয়ায় মিশিগান, মিনেসোটা ও উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের বায়ুমান বেশ কয়েক দিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

শিকাগোতে জারি করা বায়ুমান সতর্কতার মেয়াদ বাড়িয়ে বলা হয়, শনিবার সন্ধ্যায় ধোঁয়া আবার ফিরে আসতে পারে এবং তা রোববার পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

পরিবেশবাদীরা এই উপর্যুপরি দাবানলের ধোঁয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসূত্রকে জোরালোভাবে সামনে এনেছেন। উইসকন্সিনভিত্তিক সংস্থা ‘ক্লিন উইসকন্সিন’-এর বিজ্ঞান কর্মসূচির পরিচালক পল ম্যাথিউসন বলেন, ‘ক্রমাগত ধোঁয়াচ্ছন্ন আকাশ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে পরিবেশ দূষিত করার চেয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য বা পরিচ্ছন্ন শক্তিতে রূপান্তর ঘটানো জরুরি। কারণ এই জীবাশ্ম জ্বালানিই জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে।’

কোপারনিকাস অ্যাটমোস্ফিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের বিজ্ঞানী মার্ক পারিংটন এএফপিকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং মাটির আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে। এর ফলে দাবানলের মৌসুম আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মতো উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এর ফলে যখনই কোথাও আগুন জ্বলে ওঠে, তা দীর্ঘ সময় ধরে প্রজ্জ্বলিত থাকে এবং পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে জ্বলতে পারে।’

কানাডায় দাবানল পরিস্থিতি গত শুক্রবার আরও অবনতি হয়েছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, বিশেষ করে ওন্টারিও প্রদেশে প্রায় ২০০টিরও বেশি দাবানল এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে জ্বলছে। ২০২৩ সালের তুলনায় অবশ্য এবারের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম।

২০২৩ সালে কানাডার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ হেক্টর বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। তবে গত সপ্তাহে আগুনের তীব্রতা অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়েছে। সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৮ লাখ হেক্টর এলাকা দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত সপ্তাহের শুরুতেও এই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ১৬ লাখ হেক্টর।

ওন্টারিওর এই দাবানলে কোনো প্রাণহানি না হলেও ঝুঁকিপূর্ণ প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।


অনুবাদ ও সম্পাদনা: আলজাজিরা স্টাফ, এএফপি এবং এপি অবলম্বনে।