Advertisement

১৯ বনাম ১, যে সংখ্যায় লেখা বিশ্বকাপ ফাইনালের গল্প

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
১৯ বনাম ১, যে সংখ্যায় লেখা বিশ্বকাপ ফাইনালের গল্প
স্পেন না আর্জেন্টিনা কার হাতে উঠবে শিরোপা। ছবি: এবিসি

এক দল সাত ম্যাচেই করেছে ১৯ গোল, অন্য দল একই সময়ে খেয়েছে মাত্র একটি। আগামীকাল রাতের আর্জেন্টিনা-স্পেন বিশ্বকাপ ফাইনালের আগেই তাই পরিসংখ্যানের পাতায় পরিষ্কার হয়ে উঠেছে দু'দলের শক্তি ও দূর্বলতা।

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা টানা ১৩ বিশ্বকাপ ম্যাচে অন্তত দুই গোল করেছে, স্পেন সাত ম্যাচের ছয়টিতেই প্রতিপক্ষকে গোল করতে দেয়নি। বিশ্বকাপ ফাইনালের সমীকরণটি এর চেয়ে স্পষ্ট আর হতে পারত না।

একদিকে লিওনেল মেসিকে সামনে রেখে আসরের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণ, অন্যদিকে উনাই সিমন ও রদ্রির নেতৃত্বে রেকর্ড গড়া রক্ষণ এবং বলের নিয়ন্ত্রণ। নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে শিরোপা জিতবে কারা, তার উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে এই সংখ্যাগুলোর মধ্যেই।

১৯ গোলের আর্জেন্টিনা

সাত ম্যাচে ১৯ গোল করেছে আর্জেন্টিনা, ম্যাচপ্রতি গড় ২.৭১। বিশ্বকাপের এক আসরে কোনো দলের এমন গোলসংখ্যা সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ১৯৭০ সালে। সেবার ১৯ গোল করেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল পেলের ব্রাজিল।

আর্জেন্টিনা দল।
আর্জেন্টিনা দল।

বিশ্বকাপের এক আসরে আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি গোল করেছে মাত্র চারটি দল। ১৯৫০ সালে ব্রাজিল করেছিল ২২, ১৯৫৮ সালে ফ্রান্স ২৩, ১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানি ২৫ এবং একই আসরে হাঙ্গেরি ২৭ গোল করেছিল।

আর্জেন্টিনার ধারাবাহিকতাও বিস্ময়কর। টানা ১৩টি বিশ্বকাপ ম্যাচে অন্তত দুই গোল করেছে তারা, যা প্রতিযোগিতাটির রেকর্ড। সর্বশেষ কোনো ম্যাচে দুই গোল করতে পারেনি ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে হারের দিন।

টানা ১৬ বিশ্বকাপ ম্যাচে গোলও পেয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। ফাইনালে স্পেনের অভেদ্য রক্ষণ ভাঙতে পারলে ধারাটি আরও দীর্ঘ হবে।

স্পেনের জালে মাত্র এক গোল

আর্জেন্টিনার আক্রমণের বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে স্পেনের প্রায় নিখুঁত রক্ষণ। সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল খেয়েছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের চার্লস দে কেতেলারে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তাদের জালে বল পাঠাতে পেরেছেন।

উনাই সিমন ছয়টি ক্লিন শিট রেখেছেন। বিশ্বকাপের এক আসরে কোনো গোলকিপারের এত বেশি ম্যাচে গোল না খাওয়ার ঘটনা আগে ছিল না। ইয়ান ইয়ংব্লোয়েড, ওয়াল্টার জেঙ্গা, ক্লদিও তাফারেল, ফাবিয়েন বার্থেজ, অলিভার কান, জিয়ানলুইজি বুফন ও ইকার কাসিয়াসের আগের রেকর্ড ছিল পাঁচটি।

স্পেন দল
স্পেন দল

সিমন টানা ৬৫০ মিনিট গোল না খেয়েও নতুন বিশ্বকাপ রেকর্ড করেছেন। ইতালির জেঙ্গার আগের রেকর্ডটি ছিল ৫১৭ মিনিটের। এবারের আসরে স্প্যানিশ গোলকিপারের সেভের হার ৯৩ শতাংশ, যা সব গোলকিপারের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ফাইনালেও গোল না খেয়ে স্পেন চ্যাম্পিয়ন হলে মাত্র একটি গোল হজম করে বিশ্বকাপ জয়ের নতুন রেকর্ড হবে। এখন পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন দলের সবচেয়ে কম গোল খাওয়ার রেকর্ড দুটি। ফ্রান্স ১৯৯৮, ইতালি ২০০৬ ও স্পেন ২০১০ সালে দুই গোল করে হজম করেছিল।

মেসির আট গোল বনাম সিমনের দেয়াল

স্পেনের রক্ষণকে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি দিতে আসছেন মেসি। এবারের বিশ্বকাপে আট গোল করেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। একটি আসরে তার চেয়ে বেশি গোল করতে পেরেছেন মাত্র পাঁচজন।

১৯৬৬ সালে ইউসেবিও ও ১৯৫০ সালে আদেমির নয়টি করে, ১৯৭০ সালে গার্ড মুলার ১০টি, ১৯৫৪ সালে সান্দর কচিস ১১টি এবং ১৯৫৮ সালে জ্য ফঁতেন ১৩ গোল করেছিলেন।

চারটি অ্যাসিস্টও আছে মেসির

আট গোল মিলিয়ে তার সরাসরি গোল–অবদান ১২টি। বিশ্বকাপের এক আসরে এর চেয়ে বেশি গোল–অবদানের সর্বশেষ ঘটনা ১৯৭০ সালে, যখন মুলার ১৩টিতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। ফাইনালে গোল অথবা অ্যাসিস্ট করলেই সেই সংখ্যাটি ছুঁবেন মেসি।

আর্জেন্টিনার পাঁচটি গোল এসেছে বক্সের বাইরে থেকে, যা এক আসরে কোনো দলের যৌথ সর্বোচ্চ। মেসি করেছেন দুটি, অন্য তিনটি জিওভানি লো সেলসো, হুলিয়ান আলভারেজ ও এনজো ফার্নান্দেযের।

৬৪৮ পাসে স্পেনের খেলার নিয়ন্ত্রক

স্পেনের আক্রমণ কিংবা রক্ষণ, সবকিছুর কেন্দ্রেই রদ্রি। এবারের আসরে তার সফল পাস ৬৪৮টি, বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ।

রেকর্ডটি আগেও তারই ছিল। ২০২২ বিশ্বকাপে ৬৩৮টি পাস সম্পন্ন করেছিলেন রদ্রি। ২০১০ সালে স্পেনকে চ্যাম্পিয়ন করার পথে জাভির সফল পাস ছিল ৫৯৯টি।

রদ্রি।
রদ্রি।

এবার রদ্রির কাছাকাছি থাকা খেলোয়াড়েরাও স্পেনের। পাউ কুবারসি ৫৪৭ ও আয়মেরিক লাপোর্ত ৫৩৩টি পাস সম্পন্ন করেছেন। আর্জেন্টিনার মধ্যে লিয়ান্দ্রো পারেদেস ৪৯৬ ও এনজো ফার্নান্দেস ৪৪৮ পাস নিয়ে এগিয়ে।

ফাইনালে তাই শুধু বলের দখল নয়, রদ্রিকে কতটা অস্বস্তিতে রাখা যায় সেটিও আর্জেন্টিনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ড্রিবলিংয়ে ইয়ামাল, পেছনে মেসি

এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সফল ড্রিবল করেছেন লামিন ইয়ামাল, ৩০টি। তার পরে এমবাপ্পে ২৪, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ২৩ ও মেসি ২২টি ড্রিবল সম্পন্ন করেছেন।

মেসি ও ইয়ামাল
মেসি ও ইয়ামাল

এক আসরে সর্বোচ্চ ৫৩ সফল ড্রিবলের রেকর্ড দিয়েগো ম্যারাডোনার, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে। এই শতাব্দীতে সর্বোচ্চ ৪৬ ড্রিবল মেসির, ২০১৪ সালে।

ফাইনালে দুই প্রজন্মের দুই বাঁ-পায়ের তারকার মুখোমুখি লড়াইয়ের অন্যতম আকর্ষণও থাকবে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার এই ক্ষমতায়।

৩৭ ম্যাচের স্পেন, সাত ম্যাচে সাত জয় আর্জেন্টিনার

টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত স্পেন। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে এটি যৌথ সর্বোচ্চ। এর আগে ইতালি ২০১৮ থেকে ২০২১ এবং আর্জেন্টিনা ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সমানসংখ্যক ম্যাচ অপরাজিত ছিল।

অন্যদিকে এবারের বিশ্বকাপে সাত ম্যাচের সব কটিই জিতেছে আর্জেন্টিনা। এক আসরে সর্বোচ্চ জয়ের রেকর্ডে ২০০২ সালের ব্রাজিলকে ছুঁয়েছে তারা।

ফাইনাল নির্ধারিত বা অতিরিক্ত সময়ে জিতলে এক আসরে আটটি আনুষ্ঠানিক জয় পাওয়া প্রথম দল হবে আর্জেন্টিনা। একই সঙ্গে উরুগুয়ে ১৯৩০, ইতালি ১৯৩৮ এবং ব্রাজিল ১৯৭০ ও ২০০২ সালের পর শতভাগ জয়ের রেকর্ড নিয়ে বিশ্বকাপ জেতা পঞ্চম দল হবে স্কালোনির দল।

নিজেদের গোলের রেকর্ডে স্পেনও

স্পেনের গোল ১৩টি। বিশ্বকাপের এক আসরে এটি তাদের সর্বোচ্চ। ১৯৮৬ সালে এমিলিও বুত্রাগেনিওর স্পেন করেছিল ১১ গোল। ২০১০ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে তাদের গোল ছিল মাত্র আটটি।

পাঁচ গোল করে স্পেনের এক আসরের ব্যক্তিগত রেকর্ড ছুঁয়েছেন মিকেল ওইয়ারসাবাল। বুত্রাগেনিও ১৯৮৬ ও দাভিদ ভিয়া ২০১০ সালে পাঁচটি করে গোল করেছিলেন। ফাইনালে গোল করলে রেকর্ডটি একার হবে ওইয়ারসাবালের।

সংখ্যাগুলো তাই ফাইনালকে শুধু আর্জেন্টিনা-স্পেনের লড়াই হিসেবে রাখছে না। এটি ১৯ গোলের আক্রমণ বনাম এক গোল হজম করা রক্ষণ, টানা ১৩ ম্যাচে দুই গোল করা দল বনাম ছয় ক্লিন শিটের গোলকিপার, মেসির শেষ প্রান্তের জাদু বনাম ইয়ামালের নতুন প্রজন্মের সাহস।

শেষ পর্যন্ত যে সংখ্যাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে, সেটি অবশ্য একটাই। ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ডে কার গোল বেশি।