বিশ্বকাপে ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনোর অবিশ্বাস্য রেকর্ড

চলতি ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে ম্যাচ ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছেন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। উত্তর আমেরিকার তিন দেশে অনুষ্ঠিত এই আসরে দিন-রাত এক করে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে এরইমধ্যে তিন দেশে ভ্রমণ করতে গিয়ে পৃথিবীকে প্রায় আড়াই বার প্রদক্ষিণ করার সমপরিমাণ আকাশে ওড়ার রেকর্ড গড়েছেন ইনফান্তিনো।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ইনফান্তিনোর ব্যবহৃত একটি ব্যক্তিগত বিজনেস জেটের ফ্লাইট লগ, বিভিন্ন ছবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাম করেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ফাইনাল শেষে চ্যাম্পিয়ন দল আত্মপ্রকাশ করার সময় নাগাদ তিনি পৃথিবীকে প্রায় আড়াই বার প্রদক্ষিণ করার সমপরিমাণ দূরত্ব বিমানে আকাশে ওড়েছেন। কাতার সরকারের বহরে থাকা গালফস্ট্রিম জি৬৫০ জেটের সহজলভ্যতা ইনফান্তিনোর এই অসাধারণ বিমান ভ্রমণকে সম্ভব করে তুলেছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং সাইট ‘ফ্লাইটঅ্যাওয়ার’-এর তথ্য অনুযায়ী, টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে ৯ জুন লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে মেক্সিকো সিটির একটি ফ্লাইটের পর থেকে বিমানটি দিনে গড়ে একটির বেশি ফ্লাইট সম্পন্ন করেছে। এমনকি একাধিক দিনে তিনটিরও বেশি ফ্লাইট করেছে। ম্যাচগুলোতে উপস্থিত থাকার পাশাপাশি ইনফান্তিনোর ভ্রমণসূচির মধ্যে ছিল নিউইয়র্কে ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে একটি সাক্ষাৎকার এবং মিয়ামিতে ফিফা সামিটে অংশগ্রহণ। সেখানে সংস্থার ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রে সময়মতো ফিরে আসার আগে কাতারের সাবেক আমিরের জানাজায় অংশ নিতে তিনি দোহাতেও উড়ে যান। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো জুড়ে ছড়িয়ে থাকা রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচের এই টুর্নামেন্টটি তদারকি করা ব্যক্তি ইনফান্তিনোর বিমান ফ্লাইটের তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
৪৩টি ম্যাচ
রোববারের (১৯ জুলাই) আগে ইনফান্তিনো বিশ্বকাপের ৪৩টি ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন। ফ্লাইটঅ্যাওয়ার দেখিয়েছে, গালফস্ট্রিম বিমানটি মূলত ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের মধ্যকার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের জন্য সময়মতো নিউ জার্সি থেকে মিয়ামিতে ওড়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটি আর উড্ডয়ন করেনি। ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (১৮ জুলাই) নিউইয়র্ক সিটি এলাকার বিমানবন্দরগুলোতে বজ্রঝড়ের কারণে ফ্লাইটের শিডিউল বিপর্যয় ঘটে।
১৬টি স্টেডিয়াম
ইনফান্তিনো বিশ্বকাপের সবকটি অর্থাৎ ১৬টি ভেন্যুতে অন্তত একটি করে ম্যাচ দেখেছেন। মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়াম, যেখানে তিনি পাঁচটি ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন, সেটিই তার সবচেয়ে বেশিবার পরিদর্শন করা ভেন্যু।
১৩ দিনে
ইনফান্তিনো মোট ১৩ দিন একই সঙ্গে দুটি ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন, যার স্টেডিয়ামগুলো প্রায়শই শত শত মাইল দূরে অবস্থিত ছিল।
২১টি বিমানবন্দর
গালফস্ট্রিম বিমানটি টুর্নামেন্ট চলাকালীন বেশিরভাগ সময় আয়োজক শহরগুলোর প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো ব্যবহার করেছিল। তবে কখনও কখনও ছোট সাধারণ এবং ব্যবসায়িক বিমান চালনা সংক্রান্ত বিমানবন্দরগুলোর ওপরও নির্ভর করেছিল। এর মধ্যে আটলান্টার ফুলটন কাউন্টি এক্সিকিউটিভ এয়ারপোর্ট এবং মিয়ামির ওপা লোকা এক্সিকিউটিভ এয়ারপোর্ট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২৩ বার
সেমিফাইনাল পর্যন্ত উত্তর আমেরিকার অভ্যন্তরে ইনফান্তিনোকে বহনকারী জেটটি মোট ২৩ বার আন্তর্জাতিক সীমান্ত পারাপার করেছে।
১১৫ ফ্লাইট ঘণ্টা
টুর্নামেন্ট চলাকালীন গালফস্ট্রিম বিমানটি মোট ১১৫ ঘণ্টা উড্ডয়ন সময় সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে বিমানের খালি স্থানান্তর এবং কাতারে জানাজার জন্য ২৯ ঘণ্টার ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত নয়। এটি আকাশে প্রায় পাঁচ পূর্ণ দিনের সমান এবং এই সময়ে একটি সাধারণ বাণিজ্যিক বিমান তার স্বাভাবিক গতিতে নিউইয়র্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে ২০ বার যাতায়াত করতে পারত।
৫ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট
কাতারের সফরটি বাদ দিলে, সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ফ্লাইটটি ছিল ৩৪৪ মিনিটের বা ৫ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট। এটি মিয়ামি থেকে সিয়াটেল পর্যন্ত গিয়েছিল, যেখানে ইনফান্তিনো ১৫ জুন বেলজিয়াম-মিশর ম্যাচ প্রত্যক্ষ করেন। এই ফ্লাইটের সময়কাল কিক-অফ থেকে চূড়ান্ত বাঁশি পর্যন্ত তিনটি পূর্ণ বিশ্বকাপ ম্যাচের দৈর্ঘ্যের সমান।
২৮ মিনিট
স্থানান্তর ফ্লাইটগুলো বাদ দিলে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ফ্লাইটের সময় ছিল ২৮ মিনিট। গত ৬ জুলাই সিয়াটেল থেকে ভ্যাঙ্কুবারের এই সংক্ষিপ্ত ভ্রমণটি ছিল বিজ্ঞপ্তিসহ ‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো একটি টেলিভিশন সিটকমের দৈর্ঘ্যের সমান। ইনফান্তিনো সেদিন সিয়াটেলে যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়াম ম্যাচটি দেখার পরদিন ভ্যাঙ্কুভারে সুইজারল্যান্ড বনাম কলম্বিয়ার ম্যাচটি উপভোগ করেন।
৫৯ হাজার ২৮১ মাইল
এপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কাতারে সাবেক আমিরের জানাজার যাতায়াত বাদ দিয়ে টুর্নামেন্ট চলাকালীন জেটটি মোট ৫৯ হাজার ২৮১ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করেছে। এটি নিউইয়র্ক ও সিঙ্গাপুর, লস অ্যাঞ্জেলেস ও দোহা এবং লন্ডন ও অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের মধ্যকার রাউন্ড ট্রিপ ফ্লাইটের সম্মিলিত দূরত্বের চেয়েও বেশি।
৫ হাজার ৭৭২ মাইল
একক দিনের ভ্রমণসূচিতে সবচেয়ে বেশি মাইল কভার করা হয়েছিল ২৬ জুন। দিনটি শুরু হয়েছিল মিয়ামি থেকে ডালাসের একটি সকালের ফ্লাইটের মাধ্যমে। সেখান থেকে বিমানটি সিয়াটেলে যায়, যেখানে ইনফান্তিনো মিশর-ইরান ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন। শেষ ফ্লাইটটি সেই রাতে দেরিতে সিয়াটেল থেকে রওনা হয় এবং পরদিন সকালে মিয়ামিতে অবতরণ করে, যেখানে ইনফান্তিনো কলম্বিয়া বনাম পর্তুগালের ম্যাচটি দেখেন।
৫০ শতাংশ
ফিফা ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বকাপ এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে কার্বন নির্গমনের পরিমাণ অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে ২০৪০ সালের মধ্যে নেট-জিরো নির্গমনে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের স্থায়িত্ব এবং মানবাধিকার কৌশলে বলা হয়েছে, সংস্থাটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে জলবায়ু গবেষক এবং পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলো যুক্তি দেখিয়েছেন, এই বর্ধিত তিন দেশের টুর্নামেন্টটি যেকোনো বিশ্বকাপের তুলনায় বায়ুমণ্ডলকে সবচেয়ে বেশি দূষিতকারী গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি করতে পারে। দল, ভক্ত এবং কর্মকর্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাপক বিমান ভ্রমণের কারণে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি কার্বন-নিবিড় বিশ্বকাপ হতে চলেছে।
.png)








