Advertisement

মেগা মঞ্চে হবে ফুটবলের পরবর্তী বিশ্বকাপ, দেখুন কবে-কখন-কোথায়

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
মেগা মঞ্চে হবে ফুটবলের পরবর্তী বিশ্বকাপ, দেখুন কবে-কখন-কোথায়
ওপরের সারিতে (বাঁ থেকে) স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর ফুটবল সমর্থক; নিচের সারিতে (বাঁ থেকে) আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ের সমর্থকেরা নিজ নিজ দলের জাতীয় পতাকায় নিজেদের রাঙিয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যেকার ফাইনাল খেলার মাধ্যমে শেষ হয়েছে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল। যেখানে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ষোলো বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। দ্বিতীয় শিরোপা জিতে বিশ্বকাপের সফলতম দলগুলোর তালিকায় ফ্রান্স ও উরুগুয়ের পাশে জায়গা করে নিয়েছে লা রোহা।

চলতি বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরেই অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে পরবর্তী বিশ্বকাপ কবে, কখন এবং কোথায় অনুষ্ঠিত হতে যাবে। জানা গেছে, পরবরতী বিশ্বকাপ এক নজিরবিহীন আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কারণ, ফুটবল ইতিহাসের ১০০ বছর পূর্তি হচ্ছে পরবর্তী বিশ্বকাপে।

নিচে পরবর্তী বিশ্বকাপের সূচি, স্বাগতিক দেশ ও আনুষঙ্গিক নানা তথ্য নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

পরবর্তী ফিফা বিশ্বকাপ কখন

ফিফা বিশ্বকাপের পরবর্তী ২১তম আসরটি অনুষ্ঠিত হবে ২০৩০ সালে। প্রস্তাবিত খসড়া সূচি অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের ৮ ও ৯ জুন উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে শতবর্ষপূর্তির উদ্বোধনী ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ১৩ ও ১৪ জুন আসরের মূল আয়োজক দেশ মরক্কো, পর্তুগাল এবং স্পেনে মূল উদ্বোধনী ম্যাচগুলো গড়াবে।

বিশ্বকাপের মেগা ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ জুলাই। তবে ফিফা এখনও পূর্ণাঙ্গ ম্যাচের চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা করেনি।

কোথায় অনুষ্ঠিত হবে ২০৩০ সালের আসর

আসরের মূল ও সিংহভাগ ম্যাচ যৌথভাবে আয়োজন করবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো। তবে টুর্নামেন্টের শতবর্ষ স্মরণে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে একটি করে উদ্বোধনী পর্বের ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ পাবে। এরপর বাকি সব আয়োজন ও ম্যাচ স্থানান্তরিত হবে তিন মূল আয়োজক দেশে।

ফিফা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের প্রথম আসর আয়োজনের ঐতিহাসিক সম্মান হিসেবে উরুগুয়েকে ম্যাচ দেওয়া হয়। ওই আসরের ফাইনালিস্ট বা রানার্স-আপ হিসেবে আর্জেন্টিনা পায় তাদের ম্যাচটির দায়িত্ব। অন্যদিকে তৎকালীন সময়ে টিকে থাকা একমাত্র মহাদেশীয় ফুটবল কনফেডারেশন ‘কনমেবল’-এর সদর দপ্তর হওয়ায় প্যারাগুয়েকে একটি ম্যাচ আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ফুটবল ইতিহাসে এটিই হতে যাচ্ছে প্রথম কোনো পুরুষ বিশ্বকাপ, যা তিনটি মহাদেশের ছয়টি দেশের ভৌগোলিক সীমানায় অনুষ্ঠিত হবে।

ইতোমধ্যেই যোগ্যতা অর্জন করেছে যেসব দেশ

স্বাগতিক দেশ হিসেবে ‘অটোমেটিক কোয়ালিফিকেশন’ বা সরাসরি অংশগ্রহণের নিয়মে ইতোমধ্যেই ৬টি দেশ ২০৩০ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে। দেশগুলো হলো মূল তিন আয়োজক দেশ স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো এবং শতবর্ষপূর্তি ম্যাচের তিন আয়োজক উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে। বাকি ৪২টি চূড়ান্ত জায়গার ভাগ্য নির্ধারিত হবে আগামী বছরগুলোতে ফিফার আঞ্চলিক বা মহাদেশীয় বাছাইপর্বের লড়াইয়ের মাধ্যমে।

খেলার সূচি ও ফরম্যাট

দক্ষিণ আমেরিকায় যে তিনটি দেশ উদ্বোধনী ম্যাচ খেলবে, তাদেরকে মূল গ্রুপ পর্বে অংশ নেওয়ার আগে দীর্ঘ ভ্রমণ, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম এবং নতুন করে প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত অতিরিক্ত সময় দেওয়া হবে।

৮ ও ৯ জুনের শতবর্ষের বিশেষ ম্যাচের পর ১৩ ও ১৪ জুন মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেনে বিশ্বকাপের মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং প্রথম রাউন্ডের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে।

উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ের গ্রুপে থাকা অবশিষ্ট দলগুলোর বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হবে ১৫ ও ১৬ জুন। এরপর সেসব গ্রুপের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচগুলো ২১ ও ২২ জুনে অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তাবিত সূচি রয়েছে। তবে ফিফা এখনো চূড়ান্ত ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেনি।

টুর্নামেন্ট কি ৬৪ দলে উন্নীত হতে পারে?

২০৩০ বিশ্বকাপও আপাতত ৪৮টি দল নিয়েই আয়োজিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে আয়োজিত ২০২৬ সালের আসরে প্রথমবারের মতো চালু হয়।

তবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, ফুটবলের এই সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্বকাপকে ৬৪টি দলে সম্প্রসারিত করার একটি প্রস্তাব খতিয়ে দেখবে।

সুইস সংবাদমাধ্যম ‘ব্লুউইন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইনফান্তিনো ৪৮ দলের বিশ্বমঞ্চকে এক ‘বিশাল সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই ফরম্যাটটি আরও বেশি দেশকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ এনে দিয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী ফুটবলের প্রসারে বড় ভূমিকা রাখছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে তুলনামূলক ছোট ফুটবল দেশগুলোর চমৎকার পারফরম্যান্সের কথা উল্লেখ করে তিনি যুক্তি দেন যে, ব্যাপক অংশগ্রহণ এই খেলাটির জন্যই মঙ্গলজনক। ভবিষ্যতে টুর্নামেন্টটি ৬৪ দলে উন্নীত হবে কি না; এমন প্রশ্নে ইনফান্তিনো স্পষ্ট করেন যে, এই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পর্যালোচনা ও আলোচনা করা হবে।’

ফিফা বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক পথচলা

১৯২৪ ও ১৯২৮ সালের অলিম্পিক গেমসের পুরুষ ফুটবল টুর্নামেন্টে উরুগুয়ের টানা দুটি সাফল্য থেকেই জন্ম নেয় আলাদা বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনা। সেসময় অলিম্পিকের ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করত আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি)। ফলে ফিফা জাতীয় দলগুলোর জন্য নিজেদের স্বতন্ত্র টুর্নামেন্ট চালুর সিদ্ধান্ত নেয়।

ফিফার তথ্য মতে, ১৯২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকের ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে উরুগুয়ে যখন স্বর্ণপদক জেতে, তখন গ্যালারিতে প্রায় ৫০ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। এর চার বছর পর ১৯২৮ সালে ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে অলিম্পিক শিরোপা ধরে রাখে উরুগুয়ে। এই অভূতপূর্ব সাফল্যই ফিফাকে একটি স্বতন্ত্র বিশ্বকাপ আয়োজনের বিষয়ে শতভাগ আশ্বস্ত করে।

পরবর্তীতে ১৯২৮ সালের মে মাসে ফিফা একক বিশ্বকাপের পরিকল্পনা অনুমোদন করে এবং স্বাগতিক হিসেবে উরুগুয়েকে বেছে নেয়। এর কারণ ছিল দেশটি আগের দুটি অলিম্পিক ট্রফি জিতেছিল এবং একই সঙ্গে ১৯৩০ সালে তারা নিজেদের স্বাধীনতার শতবর্ষ পালন করছিল।

অবশেষে ১৯৩০ সালের জুলাই মাসে মাত্র ১৩টি দল নিয়ে মাঠে গড়ায় ইতিহাসের প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ জাহাজে চড়ে সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে উরুগুয়ে পৌঁছায়। মনতেভিডিওর ঐতিহাসিক ‘এস্তাদিও সেন্টেনারিও’ স্টেডিয়ামের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম পুরুষ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে স্বাগতিক উরুগুয়ে।

সেই সূচনা থেকে টুর্নামেন্টের আকার বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৩০ সালের ১৩ দল থেকে এটি ১৯৯৮ সালে ৩২ দল এবং ২০২৬ সালে ৪৮ দলে উন্নীত হয়। ২০৩০ সালের এই বিশেষ আসরটি বিশ্বকাপের শতবর্ষ পূর্ণ করবে এবং তিন মহাদেশ ও ছয় দেশের মাটিতে আয়োজিত প্রথম টুর্নামেন্ট হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করবে।

২০৩০ বিশ্বকাপের পর কী?

২০৩০ পরবর্তী পুরুষদের ফিফা বিশ্বকাপটি অনুষ্ঠিত হবে ২০৩৪ সালে, যার একক আয়োজক দেশ সৌদি আরব। অন্য কোনো দেশ বিড না করায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরবকে ২০৩৪ বিশ্বকাপের স্বাগতিক হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেয়।

২০৩০ সালের মতো ছয় দেশ ও তিন মহাদেশে ছড়ানো আসর না হয়ে, ২০৩৪ বিশ্বকাপটি সম্পূর্ণভাবে একক কোনো দেশে আয়োজিত হতে যাচ্ছে। তবে ফিফা এখনও সেই টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত তারিখ বা সূচি ঘোষণা করেনি।

সূত্র: আলজাজিরা