ঢাবির গবেষকদের নতুন উদ্ভাবন

সুপার ক্যাপাসিটরে মিলবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন শক্তি, চার্জ-ডিসচার্জে বাঁচবে সময়

সুপার ক্যাপাসিটরে মিলবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন শক্তি, চার্জ-ডিসচার্জে বাঁচবে সময়
সুপার ক্যাপাসিটর। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান বিশ্বে স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি- সব ক্ষেত্রেই উন্নত শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থার চাহিদা তুঙ্গে। তবে দ্রুত চার্জিং এবং দীর্ঘস্থায়ী স্থায়িত্বের অভাব বর্তমান প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রায় একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করতে এমন উপাদানের প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এবং টেকসই হবে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষকরা এখন সুপার ক্যাপাসিটরের মতো উন্নত প্রযুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই চাহিদাকে সামনে রেখে গবেষকরা শক্তি সঞ্চয়ের এক নতুন ও শক্তিশালী পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। কোবাল্ট অক্সাইড (Co₃O₄), পলিঅ্যানিলিন (PANI) এবং রিডিউসড গ্রাফিন অক্সাইডের (rGO) সমন্বয়ে তৈরি ইলেকট্রোড (NrGO- Co₃O₄) সুপার ক্যাপাসিটরের দুনিয়ায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

কী এই নতুন প্রযুক্তি?

গবেষকরা মূলত তিনটি ভিন্ন উপাদানের শক্তিকে একীভূত করেছেন। এতে আছে কোবাল্ট অক্সাইড ন্যানোপার্টিকেল, যা একটি বিশেষ ম্যাট্রিক্সের ওপর স্থাপন করা হয়েছে। এই সংমিশ্রণটি তৈরির পর গবেষকরা FTIR, SEM, XRD এবং TEM-এর মতো অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এর গঠন ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক ড. আব্দুল কাদের মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে এই গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালিত হয়। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, গবেষণাগারে ১ এম সালফিউরিক অ্যাসিড (H₂SO₄) ইলেকট্রোলাইটের মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, এই নতুন উপাদানটি প্রতি গ্রামে ৩২৪.৩৮ ফ্যারাড (F g⁻¹) উচ্চ সুনির্দিষ্ট ক্যাপাসিট্যান্স প্রদানে সক্ষম। এর অর্থ হলো, এটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ শক্তি ধরে রাখতে পারে। এ ছাড়া এর শক্তি ঘনত্ব (Energy Density) পাওয়া গেছে ১৩.৬৩ Wh kg⁻¹, যা উন্নত মানের শক্তি সঞ্চয়কারী ডিভাইসের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

তিনি জানান, সাধারণ ব্যাটারি বা ক্যাপাসিটর বারবার চার্জ এবং ডিসচার্জ করলে তার ক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। কিন্তু এই ন্যানোকম্পোজিট উপাদানটি এক হাজার বার চার্জ-ডিসচার্জ করার পরেও তার প্রাথমিক ক্ষমতার ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ ধরে রাখতে পেরেছে। এই উচ্চ স্থায়িত্ব একে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের উপযোগী করে তুলেছে। এ ছাড়া ইলেকট্রোকেমিক্যাল ইম্পিডেন্স স্পেকট্রোস্কোপি (EIS) পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই উপাদানের ভেতর দিয়ে অত্যন্ত দ্রুত বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে, যা দ্রুত চার্জিংয়ের জন্য সহায়ক।

গবেষকরা জানিয়েছেন, এই সাফল্যের মূল কারণ হলো তিনটি উপাদানের চমৎকার সমন্বয় বা সিনার্জি। পলিঅ্যানিলিনের (PANI) বিদ্যুৎ সঞ্চয় ক্ষমতা, গ্রাফিন অক্সাইডের (rGO) অসাধারণ পরিবাহিতা এবং কোবাল্ট অক্সাইডের রাসায়নিক বিক্রিয়া করার ক্ষমতা। সব মিলিয়ে এই ইলেকট্রোডটিকে অনন্য করে তুলেছে।

ড. আব্দুল কাদের মহিউদ্দিন বলেন, এই উদ্ভাবনটি শুধু গবেষণাগারের সাফল্য নয়, বরং এটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনেও ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে লক্ষ্যমাত্রা ৭ (সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি) এবং লক্ষ্যমাত্রা ১২ (দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন) নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তি সহায়ক হবে।

ভবিষ্যতে হাইব্রিড ক্যাপাসিটর এবং বিভিন্ন স্মার্ট ইলেকট্রনিক ডিভাইসে এই উপাদানটি ব্যবহারের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।