ইরাক থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করছে যুক্তরাষ্ট্র

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ইরাক থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করছে যুক্তরাষ্ট্র
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরাকে মার্কিন সৈন্য। ছবি: সংগৃহীত

ইরাক থেকে সব সৈন্য পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রত্যাহার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এর মাধ্যমে দেশটিতে আমেরিকার দীর্ঘ ২৩ বছরের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটতে যাচ্ছে। ২০০৩ সালে তৎকালীন ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্য দিয়ে এই অধ্যায়ের শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে তা জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে রূপ নেয়।

হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলনে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন। উভয় নেতা জানান, ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সেনা প্রত্যাহার চুক্তির আলোকে এই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, ওয়াশিংটন আর ইরাকে স্থায়ীভাবে সেনা মোতায়েন রাখার কোনো প্রয়োজন দেখছে না। আমেরিকান জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ইরাকের বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন বিশাল অংশীদারিত্বের জায়গায় পৌঁছেছে। এখানে সামরিক উপস্থিতির আর কোনো দরকার নেই। আমেরিকা সবসময় ইরাককে সাহায্য করতে প্রস্তুত এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে তাদের রক্ষা করবে।

তবে তিনি মনে করেন, এখন আর তেমন কোনো পরিস্থিতির তৈরি হবে না। ট্রাম্পের এই বক্তব্য স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, মার্কিন-ইরাক সম্পর্ক এখন নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক অংশীদারিত্ব থেকে পুরোপুরি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততার দিকে মোড় নিচ্ছে।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি ট্রাম্পের বক্তব্যকে সমর্থন করে নিশ্চিত করেছেন, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাকের মাটিতে থাকা সব মার্কিন সৈন্য দেশ ত্যাগ করবে। তবে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আগের মতোই সচল থাকবে। জাইদি বলেন, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের পর মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরাকের বাইরে থাকবে, কিন্তু মার্কিন বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো ইরাকের ভেতরে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, জো বাইডেন প্রশাসনের আমলে ২০২৪ সালে আইএসবিরোধী বহুজাতিক মিশন সমাপ্ত করার যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছিল। এই সেনা প্রত্যাহার মূলত তারই বাস্তবায়ন। সেই চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য সংখ্যা ধাপে ধাপে কমানো হচ্ছিল।


ইরাকে যেভাবে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শুরু হয়

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৩ সালের মার্চ মাসে ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী মারাত্মক অস্ত্র রয়েছে—এমন দাবি তুলে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে দেশটিতে হামলা চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। যদিও পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়, ওয়াশিংটনের সেই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল।

এরপর ইরাকজুড়ে তীব্র সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে মার্কিন সেনার সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে, যা ২০০৭ সালে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৭০ হাজারে গিয়ে ঠেকেছিল।

পরে বারাক ওবামা প্রশাসনের আমলে ২০১১ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে বেশিরভাগ মার্কিন যুদ্ধাভিযানকারী সেনা ইরাক ছাড়ে। তখন কেবল কূটনৈতিক নিরাপত্তা ও সীমিত সহযোগিতার জন্য ছোট একটি দল রেখে যাওয়া হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট (আইএস) ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল এলাকা দখল করে নিলে বাগদাদের অনুরোধে আবারও মার্কিন বাহিনী ইরাকে ফিরে আসে। তাদের মূল কাজ ছিল ইরাকি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, রসদ সরবরাহ ও সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ অভিযান পরিচালনা করা।

২০২১ সালের মধ্যে আইএস তাদের সব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ইরাকি সেনাদের প্রশিক্ষণ দিতে আড়াই হাজার মার্কিন সেনা সেখানে থেকে যায়। ২০২৪ সালের চুক্তির পর সেই সংখ্যাও নামিয়ে আনা হয়। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ আমেরিকান সেনাটি ইরাক ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক সামরিক অধ্যায় পার হয়ে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগিতার এক নতুন যুগে পদার্পণ করবে।

সূত্র: ওপেন ম্যাগাজিন