জর্ডান ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

জর্ডান ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে একের পর এক ভয়াবহ ও বিধ্বংসী ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরে (ফিফথ ফ্লিট) মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাতে এবং বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই হামলা চালিয়েছে।
একই সময়ে জর্ডানের আল-আজরাক ও মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা, যুদ্ধবিমান, সেনাদের আবাসন ভবন এবং হ্যাংগার লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়। ইআরজিসি এই হামলাকে ‘দমনপীড়নমূলক’ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি ‘ক্রাশিং রেসপন্স’ বা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়ার মতো দাঁতভাঙা জবাব হিসেবে অভিহিত করেছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দাবি, বুধবার সকালে বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটিতে শক্তিশালী হামলা চালানো হয়। এতে ওই ঘাঁটির প্রধান কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার (কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র), নেভাল সাপোর্ট ম্যানেজমেন্ট সেন্টার (নৌ সহায়তা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র), বিশাল সামরিক গুদাম ও জ্বালানি ট্যাংকগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
বাহরাইনের পাশাপাশি জর্ডানের আজরাক এলাকায় অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটিতেও ইরান বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তাদের বিশেষ সামরিক অভিযান ‘নাসর ২’-এর ষষ্ঠ পর্বের অংশ হিসেবে এই হামলা পরিচালনা করে। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে, তাদের নিখুঁত হামলায় আজরাক বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন এফ-১৫, এফ-১৬ ও অত্যাধুনিক এফ-৩৫ ফাইটার জেটের একাধিক শেল্টার বা আশ্রয়স্থল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি ঘাঁটিতে মোতায়েন থাকা বেশ কয়েকটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোনও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা আনাদোলুর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ভোরে তাসনিম নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের দাবি, এটি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ এবং জর্ডানে এটি ছিল তাদের সপ্তম দফার হামলা।
আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইরান ‘সায়েকেহ’ অভিযানের অষ্টম ধাপ শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে নতুন করে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে এফ-১৮ যুদ্ধবিমানের অবস্থান এবং সামরিক সরঞ্জাম রাখার হ্যাঙ্গারে দ্বিতীয়বারের মতো ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। একইসঙ্গে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।
এসব হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা জর্ডানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব হিসেবে ধারাবাহিকভাবে এসব অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, ইরানের স্থলভাগ, আকাশসীমা কিংবা সমুদ্রসীমায় যেকোনো ধরনের হামলার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে এবং অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এদিকে ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম দেশটির অন্তত সাতটি স্থানে নতুন করে বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই এসব বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এই ধারাবাহিক ও নজিরবিহীন হামলার পর আইআরজিসি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম দেশের সাধারণ জনগণের প্রতি সরাসরি বার্তা পাঠিয়েছে। জর্ডানের জনগণের উদ্দেশে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরজিসি তাদের দেশ থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি চিরতরে অবসান ঘটানোর আহ্বান জানায়।
ইরান স্পষ্ট করে বলেছে, জর্ডানের সাধারণ মানুষের উচিত হবে না এই পবিত্র ভূমিকে অন্য কোনো মুসলিম দেশের ওপর হামলার প্ল্যাটফর্ম বা উৎক্ষেপণ বিন্দু হিসেবে মার্কিন বাহিনীকে ব্যবহার করতে দেওয়া। জর্ডানের নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারা বলে, মার্কিন সেনাদের বহিষ্কার করতে এবং সে দেশে থাকা আমেরিকার সমস্ত স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে প্রতিটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করা উচিত।
পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানে নতুন দফার হামলার ঘোষণা দিয়েছে। সেন্টকমের দাবি, এসব অভিযানের লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করা। পাশাপাশি মঙ্গলবার দিবাগত রাত থেকে ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় নৌ অবরোধ পুনরায় কার্যকর করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে সংঘাত প্রশমন ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক হলেও উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান এখনও অব্যাহত রয়েছে।




