রাশিয়ান তেলে শুল্ক কমাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, স্বস্তিতে ভারত ও চীন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
রাশিয়ান তেলে শুল্ক কমাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, স্বস্তিতে ভারত ও চীন
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ৫০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি থেকে বড় ধরনের স্বস্তি পেয়েছে ভারত ও চীনসহ সহযোগী দেশগুলো। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র। প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এবং ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল কর্তৃক প্রথম উত্থাপিত এই বিলে পূর্বের বড় আকারে শুল্কের প্রস্তাব শিথিল করা হয়েছে।

নতুন সংশোধিত বিল অনুযায়ী, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ান তেল ও গ্যাস আমদানিকারী দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের আইনি ক্ষমতা পাবেন।

মূলত এই বিশেষ বিলটির লক্ষ্য হলো রাশিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এবং অতিরিক্ত শুল্কের ভয় দেখিয়ে চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোকে রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য করা। যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা মনে করছেন, এই নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার ওপর এমন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে, যা ইউক্রেনে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধ করতে মস্কোকে বাধ্য করবে।

এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ সামরিক সৈন্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে রাশিয়ান অপরিশোধিত তেলের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা দেশ হলো চীন, ভারত, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি এবং আজারবাইজান। অন্যদিকে চীন, ফ্রান্স, জাপান, হাঙ্গেরি এবং বেলজিয়াম হলো রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান আমদানিকারক। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প যদি এই দেশগুলোর ওপর পূর্বের প্রস্তাবিত ৫০০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিতেন, তবে ভারত ও চীনের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্ক পুরোপুরি ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতো।

নতুন বিলের রূপরেখা ও বিশেষ ছাড়

প্রকাশিত নতুন বিলের খসড়ায় দেখা গেছে, রাশিয়ান তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের তৃতীয় পক্ষ বা অন্য ক্রেতাদের ওপর শুল্ক আরোপের হার আগের ৫০০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। আর তা শীর্ষ পাঁচ ক্রেতার জন্য প্রযোজ্য হবে। একই সঙ্গে এই বিলে একটি বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। যেসকল দেশ রাশিয়ার মোট গ্যাস রপ্তানির ১৫ শতাংশের কম আমদানি করে এবং বর্তমানে আমদানি কমাতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিচ্ছে, তারা এই শুল্কের আওতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকবে।

এই নিয়মের ফলে জাপান, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি এবং বেলজিয়াম শুল্কের আওতামুক্ত থাকার সুবিধা পেতে পারে।

পাশাপাশি নতুন এই বিলের মাধ্যমে রাশিয়ার নিজস্ব ‘ছায়া ট্যাংকার বহর’ রাশিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং রাশিয়ার ইয়ামাল ও আর্কটিক এলএনজি ১, ২ ও ৩ এর মতো বৃহৎ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি প্রকল্পগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হচ্ছে। তবে নতুন বিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প যদি মনে করেন কোনো নিষেধাজ্ঞা মার্কিন জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর, তবে তিনি তা সাময়িকভাবে মওকুফ করতে পারবেন।

লিন্ডসে গ্রাহামের স্বপ্ন ও বিলের ভবিষ্যৎ

প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম তার মৃত্যুর মাত্র একদিন আগে ইউক্রেন সফরে গিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, তিনি এই নিষেধাজ্ঞা বিলটি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছেছেন।

সিনেট সহযোগীরা জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে বিলটির পক্ষে ২৬ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন রয়েছে এবং আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই সমর্থন আরও বাড়বে। ফলে বিলটি দ্রুত পাস হয়ে আইনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। ২০২৫ সালের এপ্রিলে গ্রাহাম ও ব্লুমেনথাল কর্তৃক প্রথম উত্থাপিত মূল খসড়া থেকে এই বর্তমান সংস্করণটি অনেক বেশি বাস্তবসম্মত করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন মার্কিন সিনেট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য দীর্ঘ কয়েক মাসের আলোচনার পর মূল বিলের কড়া শর্তগুলো কিছুটা নরম করা হয়েছে। কারণ এই মুহূর্তে এটিই একমাত্র বিল যাতে সবার সম্মতি রয়েছে এবং রাশিয়ার ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো পথ খোলা নেই।

এদিকে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি এই বিলে ইরান এবং হিজবুল্লাহর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিও যুক্ত করতে চান, যা পাস হলে একটি বড় অর্জন হবে।

ট্রাম্প বলেন, বিলটি প্রয়াত লিন্ডসে গ্রাহামের সম্মানে করা হচ্ছে। এটি তার স্বপ্নের প্রজেক্ট ছিল এবং এটি আইনে পরিণত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিলের মূল সহ-উদ্যোক্তা ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল এই বিলে নতুন কোনো দেশের নাম যুক্ত করার বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে বিলটি অনুমোদন করেছেন। নতুন কোনো লক্ষ্যবস্তু যুক্ত করে সময় নষ্ট না করে আমাদের এটি দ্রুত পাস করার দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত।

তবে মার্কিন প্রশাসনের দ্বিতীয় একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন, এই বিলের অধীনে ইরান বা অন্য যেকোনো দেশ যদি রাশিয়ার সামরিক খাতকে সহায়তা করে, তবে তাদের ওপর এমনিতে কঠোর শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হবে।

সূত্র: এনডিভি