জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, বিশ্ববাজারে আরও বাড়ল তেলের দাম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া উত্তেজনায় বেশিরভাগই জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এর জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বুধবার (১৫ জুলাই) আবার বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সব সমুদ্রবন্দরে নতুন করে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবকাঠামোতে ইরানের পাল্টা হামলা শুরু করেছে। এ পরিস্থিতির ব্যাপক প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা দ্বিতীয় দিনের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম গত ১২ জুনের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। একইসঙ্গে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও গত ১৫ জুনের পর থেকে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছুঁয়েছে। বুধবার সকালের এই বাজারে প্রাথমিক বাণিজ্যে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার অপরিশোধিত তেলের ব্যারেল প্রতি ১ দশমকি ৪৬ মার্কিন ডলার বা ১ দশমিক ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৬ দশমিক ১৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন ডব্লিউটিআই তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১ দশমিক ১১ ডলার বা ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৮০ দশমিক ৪০ ডলারে পৌঁছেছে।
মঙ্গলবারও (১৪ জুলাই) তেলের দাম ২ শতাংশ বেড়ে এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে। মূল বিষয় হলো, বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে দফায় দফায় হামলার কারণে সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। বর্তমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো, যা এখন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী বুধবার ভোরে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর জন্য ইরান যেসব সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করছে, সেগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করতে তারা নতুন করে দফায় দফায় বিমান হামলা শুরু করেছে।
অন্যদিকে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, গত সপ্তাহে আমেরিকার সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধাবস্থা শুরু হওয়ার পর তারা আবারও হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর গত জুন মাসে দুই দেশের মধ্যে যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি ভেঙে গেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তিনি ইরানের জ্বালানি লক্ষ্যবস্তুগুলোকে একদম শেষের জন্য বাঁচিয়ে রাখছেন, তবে চূড়ান্তভাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের মূল জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানবে।
ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে ইরানও বসে নেই, তারা ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর বড় জোর হামলা শুরু করেছে। ইরানের সেনাবাহিনী বুধবার ভোরে দাবি করেছে, তারা জর্ডানের আজরাক সামরিক ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে এই বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। একইসঙ্গে আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা বাহরাইন এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন বাহিনীর অস্ত্রাগার ও সামরিক মজুত স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। ফলে গত মাসে হওয়া কূটনৈতিক চুক্তিটি স্থায়ী শান্তি আনতে পারবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত যদি আরও তীব্র হয় এবং পারস্য উপসাগরের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম খুব দ্রুত ব্যারেল প্রতি ১০০ মার্কিন ডলারের ঘর ছাড়িয়ে যাবে। তবে যদি নতুন কোনো কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৫ থেকে ৮০ ডলারের মধ্যে নেমে আসতে পারে।






