জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে ফ্রান্সের জাতীয় দিবস উদযাপিত

সাইফুল ইসলাম রনি, ফ্রান্স
জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে ফ্রান্সের জাতীয় দিবস উদযাপিত
ফ্রান্সে উদযাপিত হয়েছে জাতীয় দিবস। ছবি: সংগৃহীত

কড়া নিরাপত্তা, বর্ণাঢ্য সামরিক কুচকাওয়াজ, ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোর অংশগ্রহণ এবং দেশপ্রেমের আবহে উদযাপিত হয়েছে ফ্রান্সের জাতীয় দিবস।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাজধানী প্যারিসসহ দেশজুড়ে নানা আয়োজনে পালিত হয় ঐতিহাসিক ‘বাস্তিল দিবস’, যা ফরাসি বিপ্লবের সূচনা এবং স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত।

এদিন সকালে রাজধানীর ঐতিহাসিক শাঁজেলিজের অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হয় ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ সামরিক কুচকাওয়াজ। এতে উপস্থিত ছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব, বিদেশি রাষ্ট্রদূত এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতারা।

এবারের জাতীয় দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ইউরোপীয় ঐক্য ও সমষ্টিগত নিরাপত্তা। ইউক্রেনকে সমর্থনকারী ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর প্রায় ৫০০ সেনাসদস্য কুচকাওয়াজে অংশ নেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন ইউক্রেনের কয়েকজন সেনাসদস্যও। ফরাসি ও মিত্র দেশের যুদ্ধবিমান আকাশে যৌথ ‘ফ্লাইপাস্ট’ প্রদর্শন করে, যা দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।

জাতীয় দিবসকে ঘিরে রাজধানী প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। শাঁজে লিজে, প্লাস দ্য লা কঁকর্দ, আইফেল টাওয়ার এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ঘিরে মোতায়েন করা হয় বিপুলসংখ্যক পুলিশ, জেন্ডারমেরি, সেনাসদস্য ও বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী।

বিভিন্ন প্রবেশপথে স্থাপন করা হয় নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকি। দর্শনার্থীদের ব্যাগ তল্লাশি, পরিচয় যাচাই এবং নির্দিষ্ট প্রবেশপথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। বহু এলাকায় যান চলাচল সীমিত করা হয় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়।

ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানায়, জাতীয় দিবসে বিপুল মানুষের সমাগম এবং আন্তর্জাতিক অতিথিদের উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

কুচকাওয়াজে ফরাসি স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি জেন্ডারমেরি, দমকল বাহিনী এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা অংশ নেন। পাশাপাশি আধুনিক সামরিক যান, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয়।

আকাশে ফরাসি বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান জাতীয় পতাকার নীল, সাদা ও লাল রঙের ধোঁয়া উড়িয়ে ফ্লাইপাস্ট প্রদর্শন করে, যা ছিল জাতীয় দিবসের অন্যতম মূল আকর্ষণ।

শুধু প্যারিসেই নয় লিওঁ, মার্সেই, বোর্দো, তুলুজ, নিস, স্ট্রাসবুর্গসহ দেশের বিভিন্ন শহরে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কমিউনিটি উৎসব এবং সাধারণ মানুষের জন্য নানা উন্মুক্ত আয়োজন করা হয়।

যদিও তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানলের ঝুঁকি এবং ২০১৬ সালের নিস হামলার দশম বার্ষিকীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কয়েকটি অঞ্চলে আতশবাজি ও কিছু অনুষ্ঠান সীমিত বা বাতিল করা হয়, তবুও জাতীয় দিবসের উৎসবমুখর পরিবেশে কোনো ঘাটতি ছিল না।

১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসের বাস্তিল দুর্গ দখলের মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয়। রাজতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সেই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান আধুনিক গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার এবং আইনের শাসনের পথে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।

পরবর্তীতে ১৮৮০ সালের ১৪ জুলাই তারিখটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রান্সের জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদায় দিনটি পালিত হয়ে আসছে।

এ দিনটিতে ফরাসি সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো জাতীয় পতাকার নীল, সাদা ও লাল রঙে সজ্জিত করা হয়। ফরাসি নাগরিকদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত পর্যটকেরাও উৎসবের এই আমেজে শামিল হন।