ইসলামাবাদ চুক্তি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে গেল ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ পুরোপুরি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা মোকাবিলায় দেশের ‘প্রতিটি ইঞ্চি’ ভূখণ্ড রক্ষা করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত, কূটনৈতিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি দাবির মুখে এই আঞ্চলিক সংকট এখন এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদী জানান, ওয়াশিংটন নিজেই এই চুক্তির শর্তগুলো একের পর এক লঙ্ঘন করে এটিকে সম্পূর্ণ অকার্যকর ও ধ্বংস করে দিয়েছে। ফলে তেহরান আর এই চুক্তির কোনো বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে বাধ্য নয়। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ইরানের আধ-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের বরাতে এ খবর জানা গেছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তাদের সামরিক বাহিনী ইরানের প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতার সিংহভাগ ধ্বংস করে দিয়েছে। ট্রাম্পের এই দাম্ভিক দাবির জবাবে এক টেলিভিশন ভাষণে তীব্র ক্ষোভ ও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেজেশকিয়ান প্রশ্ন তোলেন, ওয়াশিংটন মুখে বড় বড় কথা বললেও তারা কি আসলেই যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে? তিনি বলেন, যারা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে ছিন্নভিন্ন করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে, তাদের কোনো চালই সফল হয়নি। ইরান তার বলিষ্ঠ সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি ইঞ্চি সীমানা রক্ষা করবে।
এদিকে, ট্রাম্প সুর নরম করে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর তার পূর্বের প্রস্তাবিত ২০ শতাংশ শুল্ক বা টোল আদায়ের বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে এসেছেন। হোয়াইট হাউসে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, তিনি আন্তর্জাতিক কোনো নৌপথে ট্রানজিট ফি নেওয়ার নীতি পছন্দ করেন না। এর পরিবর্তে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো ধনী উপসাগরীয় দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এই দেশগুলো ট্রানজিট ফি দেওয়ার বদলে রেকর্ড পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল অংকের নতুন বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে, যা ওয়াশিংটনের জন্য অনেক বেশি লাভজনক ও সন্তোষজনক।
ট্রাম্প নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, আমেরিকার পক্ষে একা পুরো বিশ্বের বাণিজ্যিক সুরক্ষার জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পাহারা দেওয়া এবং এর বিশাল সামরিক ব্যয় বহন করা অন্যায়। তবে ইরানকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, হরমুজ প্রণালি বিশ্ববাসীর জন্য উন্মুক্ত থাকলেও ইরানের ওপর কঠোর নৌ অবরোধ বলবৎ থাকবে। কেবল ইরানি বন্দর থেকে আসা-যাওয়া করা এবং ইরানের কোনো পণ্য বা কার্গো বহনকারী জাহাজের ওপর মার্কিন নৌবাহিনী পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ জারি রাখবে।
মাঝখানে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা নিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি কূটনীতিকে একটি সুযোগ দিয়েছিলেন কিন্তু ইরান প্রথমে হামলা চালিয়ে সেই সুযোগ নষ্ট করেছে এবং এটি তেহরানের একটি বড় ভুল ছিল।
আমেরিকার এই কঠোর অবরোধ ও আগ্রাসনের জবাবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি কমিটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানিয়েছেন, মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার পরপর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা করার জন্য পার্লামেন্টে একটি নতুন বিল পাস করা হয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, হরমুজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা ইরানের সীমারেখা এবং এটি রক্ষায় পরবর্তী সময়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই চরম যুদ্ধাবস্থার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ ওমান আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে হরমুজ প্রণালিতে সব দেশের নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে সব পক্ষের সঙ্গে নিজেদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ কূটনৈতিক মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।




