পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, এলাকাজুড়ে উত্তেজনা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুরে এক মুসলিম শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ওই এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। একইসঙ্গে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কালীঘাটে নিজের এলাকার বাইরে পুলিশ বেরোতে দেয়নি।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বারুইপুরে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে গিয়ে দেখা করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের (আসল) সাংসদ ও বিধায়কদের একটি প্রতিনিধি দল। তাদের সঙ্গে ছিলেন বিদ্রোহী তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারাও। অন্যদিকে, নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন বিজেপি বিধায়ক তথা পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তার সঙ্গে গিয়েছিলেন বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায় ও কেয়া ঘোষ।
মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীরও বারুইপুরে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে তিনি নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করবেন। একই সঙ্গে তিনি জেলার পুলিশ সুপারের কাছ থেকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানবেন।
এদিন নির্যাতিতার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন অগ্নিমিত্রা পাল। অগ্নিমিত্রা বলেন, মুখ্যমন্ত্রী আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নির্যাতিতার পরিবার সরকারের ভূমিকায় সন্তুষ্ট এবং মুখ্যমন্ত্রীর ওপর আস্থা রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, নারীদের ওপর অত্যাচার বা পুলিশি গাফিলতির ক্ষেত্রে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
গত রোববার বারুইপুর যাওয়ার কথা ছিল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। কিন্তু তার কালীঘাটের বাড়ি পুলিশ বাহিনী দিয়ে ঘিরে তাকে গৃহবন্দি করা হয় বলে মমতা অভিযোগ তোলেন। গতকাল সোমবার কালীঘাট তৃণমূলের তরফে দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডল ও এলাকার বিধায়ক বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর মঙ্গলবার বিদ্রোহী তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বও পৃথকভাবে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন।
মঙ্গলবার সকালে বারুইপুরে পৌঁছান আসল তথা বিদ্রোহী তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা। ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের ওই প্রতিনিধি দলে রয়েছেন দুই সাংসদ সায়নী ঘোষ, কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং সদ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছেড়ে বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়া প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য।
বারুইপুরে পৌঁছালে প্রথমে ঋতব্রত মন্ত্রী ওই আসল তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হয়। পরে অবশ্য অনুমতি মিললে তারা নির্যাতিতার বাড়িতে যান। সেখানে তারা তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন এবং ভুক্তভোগীর বাবার সঙ্গে কথা বলেন।
সেখান থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা এখানে এসেছি। আমাদের অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এই ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা যাতে আর না হয়, সেই জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিতে হবে।
বারুইপুরে মঙ্গলবার সকালেই পৌঁছে যান আইএসএফ নেতা ও বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী। তিনি নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি দাবি করেন, বিজেপি সরকার আমলে নারীরা সুরক্ষিত নেই কেন এটা বিজেপিকে ভাবতে হবে। একই সঙ্গে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
ঘটনার সূত্রপাত ও বর্তমান পরিস্থিতি
গত রোববার সকালে পুকুর থেকে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, ওই শিশুকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাস্তা ও রেল অবরোধ করেন উত্তেজিত জনতা। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দ্রুত নির্যাতিতার বাবার সঙ্গে কথা বলেন এবং সুবিচারের আশ্বাস দেন।
পরে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে গঠন করা হয় ৬ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ধৃতরা হলো আনন্দ সর্দার, প্রভাস মণ্ডল এবং দিবাকর সর্দার। এদিকে, নাবালিকার দেহ উদ্ধারের পর গণপিটুনিতে মৃত্যু হয় এক যুবকের।
এই ঘটনায় সক্রিয় হয়েছে জাতীয় মহিলা কমিশন। স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ নিয়ে কমিশন রাজ্যের ডিজির কাছে ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছে। সাতদিনের মধ্যে তদন্তের অগ্রগতি ও গৃহীত পদক্ষেপের রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনার তথ্যও দেওয়া হয়েছে কমিশন।
শুভেন্দু অধিকারী গতকাল সোমবার জানান, মূল ধর্ষণ-খুনের মামলার পাশাপাশি গণপিটুনিতে এক সন্দেহভাজনের মৃত্যু, পুলিশকে মারধর এবং রেললাইন অবরোধের ঘটনাতেও পৃথক মামলা দায়ের হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনায় প্রায় ২০০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




