যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার জেরে আবারও তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার জেরে আবারও তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি
ছবি: সংগৃহীত

চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরেক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় শুক্রবার (১০ জুলাই) তেলের দাম বেড়েছে। এর ফলে ধারণা করা হচ্ছে তেলের দাম সাপ্তাহিক বৃদ্ধির প্রবণতার দিকে এগোচ্ছে। মূলত হরমুজ প্রণালিতে দুই দেশের লড়াইয়ের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বাজার পর্যবেক্ষণপূর্বক সর্বশেষ তথ্যের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শুক্রবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৯ সেন্ট বা ০ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এতে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড ৭৬ দশমিক ৪৯ ডলারে কেনাবেচা হচ্ছে। একইসঙ্গে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১৯ সেন্ট বা ০ দশমিক ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৭২ দশমিক ২৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৬ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআই-এর দাম ৫ শতাংশ বৃদ্ধির দিকে এগিয়ে চলেছে।

তেলের বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভান্ডা ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি জানান, সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় এটি কিছুটা কমলেও বাজারে এখনও বড় ঝুঁকি রয়ে গেছে। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল এখন প্রায় সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। এটি কখন স্বাভাবিক হবে তার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরান শেষ পর্যন্ত কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করবে—বাজারের এমন আশাবাদের কারণে দামের লাগামহীন বৃদ্ধি কিছুটা আটকে রয়েছে।

আমেরিকা ও ইরানের এই নতুন লড়াই তিন সপ্তাহের পুরনো একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে চরম সংকটের মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের দক্ষিণ উপকূলীয় ও পূর্বের প্রদেশগুলোতে হামলা চালিয়েছিল। এর পর বৃহস্পতিবার পাল্টা আঘাত হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।

এছাড়া ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো দেশের প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্র থাকা বুশেহরসহ সমগ্র দক্ষিণ ইরান জুড়ে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেছে। ওমানের কাছে জলপথ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি কাতারি এলএনজি ট্যাংকারে ইরান হামলা চালানোর পর মূলত এই নতুন সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে।

নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত এমন এক সময়ে এলো যখন সপ্তাহব্যাপী গণ জানাজা ও শোভাযাত্রা শেষে গতকাল নিজ শহর মাশহাদে সমাহিত করা হয়েছে ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রথম দিনে তিনি প্রাণ হারান। এই সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়াটি আবার পিছিয়ে গেল। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ বা এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।

জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, নতুন হামলার পর ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে জাহাজ মালিকরা ট্যাংকার চলাচল বন্ধ রাখায় বৃহস্পতিবার এই রুটে নৌ চলাচল থমকে দাঁড়ায়।

উদ্ভূত পরিস্থিতি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার সাংবাদিকদের জানান, এই নতুন লড়াইয়ের কারণে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হবে বলে তিনি মনে করেন না। ট্রাম্পের দাবি, যা কিছুই ঘটুক না কেন, তা খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে এএনজে ব্যাংকের সিনিয়র কমোডিটি স্ট্র্যাটেজিস্ট ড্যানিয়েল হাইনস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে তীব্র হামলা চালালেও তারা তেহরানের মূল জ্বালানি অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা থেকে বিরত রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইতিবাচক মন্তব্যের কারণে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছে।