বিখ্যাত নারী মহাকাশচারী ওয়েলি ফাংক মারা গেছেন

মহাকাশ জয়ের ইতিহাসের অন্যতম পথপ্রদর্শক বৈমানিক ও মহাকাশচারী প্রশিক্ষণার্থী ওয়েলি ফাংক ৮৭ বছর বয়সে মারা গেছেন। আমেরিকার মহাকাশ যুগের শুরুতে আরও ১২ জন নারীর সঙ্গে কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন তিনি। প্রশিক্ষণের দীর্ঘ ৬০ বছর পর মহাকাশে পাড়ি দিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন এ নারী। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডালাসের উপশহর গ্রেপভাইনে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।
এক সময় কেবল নারী হওয়ার কারণে নাসার প্রাথমিক মহাকাশচারী দল থেকে ওয়েলি ফাংককে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লিঙ্গ বৈষম্যের সেই বাধা কাটিয়ে জীবনের শেষভাগে এসে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ২০২১ সালের জুলাই মাসে ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা ও ধনকুবের জেফ বেজোসের আমন্ত্রণে তার কোম্পানি ‘ব্লু অরিজিন’-এর নিউ শেপার্ড রকেটশিপের প্রথম বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন ফাংক।
মহাকাশে যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কখনও ভাবিনি, আমি আসলেই মহাকাশে যেতে পারব।’ ১০ মিনিটের সেই মহাকাশযাত্রা ৮২ বছর বয়সি ফাংকে পৃথিবীর ইতিহাসে মহাকাশে পৌঁছানো সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তির মর্যাদা এনে দেয়। তিনি ভেঙে দেন সাবেক মার্কিন সিনেটর ও মহাকাশচারী জন গ্লেনের রেকর্ড। গ্লেন ১৯৯৮ সালে ৭৭ বছর বয়সে মহাকাশে গিয়েছিলেন।
বেজোসের উদ্বোধনী ফ্লাইটে আরও ছিলেন তার ভাই মার্ক এবং একজন ১৮ বছর বয়সি ডাচ তরুণ। এই যাত্রায় ডাচ তরুণ মহাকাশে যাওয়া সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তির খ্যাতি লাভ করেন।
যাত্রা শেষে সফলভাবে টেক্সাসের মরুভূমিতে প্যারাশুটের সাহায্যে রকেট ক্যাপসুলটি অবতরণের পর উচ্ছ্বসিত ফাংক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি এই দিনটির জন্য অনেক লম্বা সময় ধরে অপেক্ষা করছিলাম। আমি আবারও দ্রুত মহাকাশে যেতে চাই।’ রয়্যাল ব্লু ফ্লাইটের পোশাক, চওড়া হাসি আর ছোট সাদা চুলের ফাংকের সেই প্রাণবন্ত রূপ তরুণ প্রজন্মকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে।
ওই সময় হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জেন সাকি তাকে ‘আমেরিকার নতুন সুইটহার্ট’ হিসেবে আখ্যা দেন। অবশ্য সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ হিসেবে তার এই রেকর্ডটি মাত্র তিন মাস স্থায়ী হয়েছিল। ২০২১ সালের অক্টোবরে ‘স্টার ট্রেক’ সিরিজের বিখ্যাত অভিনেতা ৯০ বছর বয়সি উইলিয়াম শ্যাটনার এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালে ৯০ বছর বয়সি বিমান বাহিনীর প্রবীণ সেনা এড ডুইট মহাকাশে গিয়ে সেই রেকর্ড ভাঙেন। তবে ওয়েলি ফাংক এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক নারী মহাকাশচারী হিসেবে রেকর্ডের পাতায় অমর হয়ে আছেন।
মহাকাশে যাওয়ার আজীবনের স্বপ্ন পূরণের আগে ওয়েলি ফাংক বিমান চালনা ক্ষেত্রে নারীদের সব বাধা ভেঙে নজির স্থাপন করেন। ১৯৩৯ সালে জন্ম নেওয়া মেরি ওয়ালেস ফাংক তার ক্যারিয়ারে ৩ হাজারের বেশি পাইলটকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং ১৯ হাজার ঘণ্টারও বেশি সময় আকাশে বিমান উড়িয়েছেন। তিনি ছিলেন ওকলাহোমার মার্কিন সামরিক ঘাঁটির প্রথম নারী ফ্লাইট প্রশিক্ষক, ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রথম নারী পরিদর্শক এবং ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের প্রথম নারী বিমান নিরাপত্তা তদন্তকারী।
১৯৬১ সালে নাসার বিখ্যাত মার্কারি প্রোগ্রামের জন্য নির্বাচিত পুরুষদের মতো কঠোর শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষায় বসা ১৩ জন নারীর মধ্যে ফাংক ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। পরীক্ষায় অনেক পুরুষকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান অর্জন করলেও কেবল নারী হওয়ার কারণে এই দলটিকে—যা ‘মার্কারি ১৩’ নামে পরিচিত—নাসা বাদ দিয়ে দেয়। এমনকি প্রথম আমেরিকান হিসেবে পৃথিবীর কক্ষপথ ঘুরে আসা জন গ্লেনও তখন কংগ্রেসে নারীদের মহাকাশে নেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন। অন্যদিকে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৬৩ সালেই ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভাকে মহাকাশে পাঠিয়ে প্রথম নারী মহাকাশচারীর ইতিহাস গড়ে। আর আমেরিকার প্রথম নারী হিসেবে স্যালি রাইড মহাকাশে যান ১৯৮৩ সালে।
সূত্র: রয়টার্স





