অং সান সু চি মারা গেছেন?

মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী অং সান সু চির হদিস মিলছে না। পাঁচ বছর আগে সামরিক জান্তা সরকার গঠনের পর থেকে ৮১ বছর বয়সি এই নোবেলজয়ীকে বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তার আইনজীবীদেরও দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। সু চি বেঁচে আছেন কি না কিংবা কেমন আছেন, তা নিয়ে খোদ তার পরিবার ও আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সোমবার (১৩ জুলাই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট জানিয়েছে, গত মাসে মিয়ানমারের সাবেক রাজধানী ইয়াঙ্গুনে সু চির বাড়িতে মারা গেছে তার প্রিয় সংকর প্রজাতির বিশ্বস্ত কুকুর ‘টিআইচি’। ২০১০ সালে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সু চিকে কুকুরটি উপহার দিয়েছিলেন তার ছেলে কিম আরিস।
মায়ের স্মৃতিবিজড়িত কুকুরটির মৃত্যুর পর লন্ডনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কিম আরিস বলেন, ‘আমার মনে হয়, মাকে আমি যা কিছু দিয়েছি তার মধ্যে এটিই ছিল সেরা উপহার। টিআইচি তার প্রতি খুব বিশ্বস্ত ছিল।’
কুকুরটির মৃত্যুর চেয়ে কিম আরিসকে এখন বেশি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে মায়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর। মায়ের ‘জীবিত থাকার প্রমাণ’ (প্রুফ অব লাইফ) মিয়ানমারের সামরিক জান্তার কাছ থেকে আদায় করতে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও মন্ত্রীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন আরিস।
২০২২ সালের শেষের দিকে জান্তার প্রহসনমূলক বিচার শেষের পর থেকে সু চিকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারের কারাগারে থেকে সু চিকে নিয়ে মঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন কিছু খবর এলেও, তার সত্যতা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব।
চলতি বছরের এপ্রিলে সামরিক জান্তা দাবি করেছিল, সু চিকে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়েছে। তবে কূটনীতিকদের বারবার সাক্ষাতের অনুরোধ তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। জান্তার কর্মকর্তারা শুধু জানান যে তিনি সুস্থ আছেন।
সু চিকে গৃহবন্দি করার সময় প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায়, তিনি একটি অচেনা ভবনের ভেতরে পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছেন। তবে ছবিটির সত্যতা ও সময় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তার ছেলে কিম আরিস। তিনি বলেন, যদি তিনি (সু চি) সত্যি গৃহবন্দিও থাকেন, তবে তা ইয়াঙ্গুনে তার নিজের বাড়িতে নয়। কারণ, নেপিডোতে তার বাড়িটি সামরিক বাহিনী ভেঙে ফেলেছে।
অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী সিনিয়র জেনারেল ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং সু চির প্রসঙ্গ উঠলেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। গত মাসে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে ও মে মাসে মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে আলোচনায় সু চির প্রসঙ্গ উঠলে মিন অং হ্লাইং ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলে কূটনীতিকরা জানান।
অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী এই নেতার এমন আচরণে আন্তর্জাতিক মহলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, জান্তা প্রধান হয়তো সু চির বেঁচে থাকার প্রমাণ দিতে অক্ষম। কারণ, তিনি হয়তো মৃত অথবা গুরুতর অসুস্থ। অবশ্য থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ মরগান মাইকেলস মনে করেন, সু চির মতো বড় নেত্রীর মৃত্যুর খবর গোপন রাখা অসম্ভব। একজন কূটনীতিকের মতে, তীব্র রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণেই সু চিকে এভাবে বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।
গত ১২ জুলাই ব্যাংককে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংগঠনের (আসিয়ান) বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সু চির বিষয়টি জান্তার সামনে উত্থাপন করেছেন। অতীতে ক্ষমতায় থাকাকালীন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার নিন্দা না করায় সু চির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ম্লান হলেও, তার প্রতি বিশ্বনেতাদের একাংশের সমর্থন এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
সামরিক জান্তা এখন আসিয়ানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ফিরতে ও জাতিসংঘে ক্ষমতাচ্যুত বেসামরিক সরকারের প্রতিনিধির জায়গায় নিজেদের আসন ফিরে পেতে মরিয়া। কূটনীতিকদের মতে, জান্তা সরকার যদি সু চিকে মুক্তি দেয় বা অন্তত কূটনীতিকদের তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেয়, তবে বিশ্বমঞ্চে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পথ সুগম হতে পারে।
তবে সু চির মুক্তি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। অহিংস আন্দোলনের প্রতীক সু চির মুক্তি জান্তাবিরোধী লড়াইয়ে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার ঐক্যকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে অনেক বিদেশি কূটনীতিক মনে করেন। কারণ বর্মী জাতীয়তাবাদী সু চি ক্ষমতায় থাকাকালীন বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতি কঠোর আচরণ করেছিলেন, যার ফলে অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠী তাকে পছন্দ করে না।
অন্যদিকে, মরগান মাইকেলসের মতে, জান্তা সরকার সশস্ত্র প্রতিরোধের চেয়ে সু চির ১৯৮৮ সাল থেকে করে আসা অহিংস আন্দোলনকে বেশি ভয় পায়। কারণ, বর্মন সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ওপর সু চির এখনও জাদুকরি প্রভাব রয়েছে। গত ১৯ জুন তীব্র ঝুঁকির মধ্যেই তার ৮১তম জন্মদিন পালন করেছেন সমর্থকেরা।
সু চির পক্ষ থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ভিক্ষা দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেন। সু চিকে নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা চললেও, তার ছেলে কিম আরিস চান না যে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা বিশ্ববাসী ভুলে যাক।
মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যাসিস্টেন্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনারস’ (এএপিপি)-এর তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে এখনও ১৪ হাজার ৫১৭ জন রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। সু চি তাদের মধ্যে একজন। দেশটির কারাগারগুলোতে চিকিৎসার মান অত্যন্ত নাজুক এবং তীব্র গরমেও বন্দিদের জন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেই।
জানা গেছে, অন্য বন্দিরা সুবিধা পান না বলে সু চি নিজেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেল নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কেবল এই বছরেই জান্তার হেফাজতে থাকা অবস্থায় ৬০ জনেরও বেশি রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যু নিশ্চিত করেছে এএপিপি।






