টানা বৃষ্টিতে নড়াইলের ৩ পৌর শহর জলাবদ্ধ, চরম দুর্ভোগে বাসিন্দারা

টানা দুই দিনের ভারী বর্ষণে নড়াইল জেলার তিনটি পৌরসভা নড়াইল, লোহাগড়া ও কালিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে চরম জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। ঘরবাড়ি, সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরে পানি ঢুকে থমকে গেছে স্বাভাবিক জনজীবন।
শত শত পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। কোথাও চুলা জ্বালা বন্ধ, কোথাও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, আবার কোথাও বৃষ্টির পানিতে মূল্যবান আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাশয় ভরাট ও দখল এবং অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই এই জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে নড়াইল পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দুর্গাপুর, আলাদাতপুর, মহিষখোলা, ভাদুলিডাঙ্গা, কুড়িগ্রাম, ভওয়াখালী, বাহিরডাঙ্গা ও বরাশুলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, সরকারি কার্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শতাধিক ঘরবাড়িতে পানি জমে রয়েছে।

বহু পরিবারের ঘরের ভেতরে জমেছে হাঁটুপানি। রান্নাঘরে পানি ওঠায় রান্না বন্ধ রয়েছে।

আবার বহু টিউবওয়েল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট।

জানা যায়, ১৯৭২ সালে ২৮ দশমিক ৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে নড়াইল পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৯৯ সালে এটি দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন হয়নি।
শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত চিত্রা নদী, রূপগঞ্জ-তুলারামপুর খাল, ভাদুলিডাঙ্গা-মুলিয়া খাল এবং উত্তর ভওয়াখালী-বাঁশভিটা-মুলিয়া খালসহ কয়েকটি জলাশয় একসময় প্রাকৃতিকভাবে পানি নিষ্কাশনের কাজ করলেও বর্তমানে সেগুলোর সিংহভাগ ভরাট ও দখল হয়ে গেছে। এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে সড়ক নির্মাণ এবং পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ায় বৃষ্টির পানি সহজে নিষ্কাশিত হতে পারছে না।
এলাকাবাসীর দুর্ভোগের কথা জানিয়ে ভাদুলিডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা সুকান্ত বিশ্বাস বলেন, পর্যাপ্ত নালা নেই, যেগুলো আছে সেগুলোরও অনেকগুলো অচল। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
দুর্গাপুর এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, রাতভর বৃষ্টিতে ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়েছে। আসবাবপত্র সরিয়ে রাখতে হয়েছে। রান্নাঘরে পানি ওঠায় রান্না করাও সম্ভব হয়নি।
আলাদাতপুর এলাকার সোহাগ খান বলেন, প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই দুর্ভোগে পড়তে হয়। ড্রেন না থাকায় পানি নামতে অনেক সময় লাগে।
মহিষখোলা এলাকার বাসিন্দা সৌরভ বলেন, সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে যাওয়ায় শিশু ও বৃদ্ধদের চলাচল খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
কুড়িগ্রাম এলাকার বাসিন্দা এস. এম. হালিম মন্টু বলেন, একসময় পানি দ্রুত নেমে যেত। এখন খাল-জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি আটকে থাকে।
বাহিরডাঙ্গা এলাকার রুবেল শেখ বলেন, সড়কে পানি জমে থাকায় কর্মস্থলে যাওয়া-আসা কঠিন হয়ে পড়েছে। যানবাহনও ঠিকমতো চলতে পারছে না।
বরাশুলা এলাকার জুয়েল মিয়া বলেন, বাড়ির উঠান ও ঘরের মেঝে পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রতিবছর একই সমস্যার সমাধান না হওয়ায় আমরা চরম ভোগান্তিতে আছি।
নড়াইল প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এনামুল কবির টুকু বলেন, আমার বাসার কাঁথা-বালিশ, আলমারিসহ প্রায় সব আসবাবপত্র ভিজে গেছে। টিউবওয়েল পানির নিচে চলে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ছোট শিশুদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় আছি।
জলাবদ্ধতার বিষয়টি স্বীকার করে নড়াইল পৌর প্রশাসক মো. নাজমুল হুদা বলেন, দেশব্যাপী টানা অতিবর্ষণের প্রভাবে নড়াইল পৌরসভায়ও তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থাই এ সমস্যার মূল কারণ। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জলাবদ্ধতা নিরসনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পরিদর্শন করে তাৎক্ষণিক সমাধানে পৌরসভার টিম নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
লোহাগড়া পৌরসভাতেও একই চিত্র
দুই দিনের টানা বর্ষণে লোহাগড়া পৌর শহরের লক্ষ্মীপাশা, রাজুপুর, খলিশাখালী, গোপীনাথপুর, জয়পুর, ব্যাপারীপাড়া, মদিনাপাড়া, কলেজপাড়া, সরকারপাড়া, আলা মুন্সির মোড়, সরদারপাড়া, পোদ্দারপাড়া, মোচড়া ও গন্ধবাড়িয়াসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। অসংখ্য বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় পরিবারগুলো সারাদিন বালতি দিয়ে ঘরের পানি সেচে বাইরে ফেলতে ব্যস্ত সময় পার করছে। রান্নাঘর ডুবে যাওয়ায় অনেক পরিবারে খাবার রান্না বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাশয় ভরাট ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণেই প্রতিবছর একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। দ্রুত কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে লোহাগড়া পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে জমানো পানি অপসারণের কাজ চলছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কালিয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় কলেজ রোড
অন্যদিকে কালিয়া পৌরসভার অত্যন্ত ব্যস্ততম ‘কলেজ রোড’ সামান্য বৃষ্টিতেই জলে ভেসে গেছে। মুন্সি বেকারির চৌরাস্তা থেকে জামায়াতে ইসলামী কার্যালয় পর্যন্ত সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পথচারী, শিক্ষার্থী ও যানবাহন চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির ড্রেনেজ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকার্যকর থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে যায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তারা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং স্থায়ী ড্রেন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
জেলার সচেতন মহলের মতে, প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী কোনো সমাধানের উদ্যোগ চোখে পড়ে না। খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে নড়াইলের তিন পৌর এলাকার দীর্ঘদিনের এই জলাবদ্ধতা নিরসনে অবিলম্বে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।





