কোলেস্টেরল স্বাভাবিক হলেও থাকতে পারে হৃদ্রোগের ঝুঁকি

অনেকেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর পর শুধু মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা দেখেই নিশ্চিন্ত হয়ে যান। কিন্তু হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোট কোলেস্টেরল স্বাভাবিক থাকলেই যে হৃদ্যন্ত্র সুস্থ আছে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। হৃদ্স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বোঝার জন্য কোলেস্টেরল রেশিওও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
কোলেস্টেরল রেশিও মূলত শরীরে মোট কোলেস্টেরল এবং এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরলের অনুপাত। এই অনুপাত যত কম হবে, সাধারণভাবে হৃদ্রোগের ঝুঁকিও তত কম বলে ধরা হয়।
কোলেস্টেরল রেশিও কী?
কোলেস্টেরল রেশিও বের করতে মোট কোলেস্টেরলের মাত্রাকে এইচডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা দিয়ে ভাগ করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক,
মোট কোলেস্টেরল ২০০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার
এইচডিএল ৫০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার
তাহলে কোলেস্টেরল রেশিও হবে: ২০০ ÷ ৫০ = ৪
অর্থাৎ আপনার কোলেস্টেরল রেশিও ৪:১।
রেশিও কত হলে ভালো?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোলেস্টেরল রেশিও সাধারণভাবে এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
৩.৫-এর নিচে: সবচেয়ে ভালো বা আদর্শ
প্রায় ৪: ভালো
৫-এর বেশি: হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে
৬ বা তার বেশি: উচ্চ ঝুঁকির পর্যায়
তবে শুধু এই একটি সংখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। চিকিৎসক রোগীর বয়স, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপানের অভ্যাস, পারিবারিক ইতিহাস এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফলও বিবেচনা করেন।
এইচডিএল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এইচডিএলকে ভালো কোলেস্টেরল বলা হয়। কারণ এটি রক্তনালিতে জমে থাকা অতিরিক্ত কোলেস্টেরল যকৃতে ফিরিয়ে নিতে সাহায্য করে। ফলে ধমনিতে চর্বি জমার ঝুঁকি কমে এবং হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের সম্ভাবনাও হ্রাস পেতে পারে।
অন্যদিকে এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল বেশি হলে ধমনির ভেতরে চর্বির আস্তরণ তৈরি হতে পারে, যা রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে।
শুধু মোট কোলেস্টেরল দেখলেই হবে না
চিকিৎসকদের মতে, একটি সম্পূর্ণ লিপিড প্রোফাইল রিপোর্টে সাধারণত যে বিষয়গুলো দেখা হয়, সেগুলো হলো মোট কোলেস্টেরল, এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরল, এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড এবং কোলেস্টেরল রেশিও।
এসব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেই হৃদ্রোগের প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাই শুধু একটি সংখ্যা দেখে আতঙ্কিত বা নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত নয়।
কীভাবে ভালো রাখা যায় কোলেস্টেরল রেশিও?
কোলেস্টেরল রেশিও উন্নত করতে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। যেমন-
- প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করুন।
- শাকসবজি, ফল, ডাল এবং আঁশসমৃদ্ধ খাবার বেশি খান।
- অতিরিক্ত ঘি, মাখন, চর্বিযুক্ত মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খান।
- ধূমপান করলে তা ছেড়ে দিন।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়মিত নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোলেস্টেরলের ওষুধ বন্ধ করবেন না।
কতদিন পরপর পরীক্ষা করাবেন?
যাদের বয়স ২০ বছরের বেশি, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে লিপিড প্রোফাইল করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। আর যদি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, ধূমপানের অভ্যাস বা পরিবারে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরও ঘন ঘন পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
কোলেস্টেরল রেশিও হৃদ্স্বাস্থ্য মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি একমাত্র নির্দেশক নয়। আপনার মোট কোলেস্টেরল, এলডিএল, এইচডিএল, ট্রাইগ্লিসারাইড এবং অন্যান্য ঝুঁকির কারণ একসঙ্গে বিবেচনা করেই চিকিৎসক সঠিক মূল্যায়ন করেন। তাই স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেলে শুধু একটি সংখ্যা নয়, পুরো রিপোর্টই চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন। এতে প্রয়োজন হলে সময়মতো জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে ভবিষ্যতের হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সূত্র:এনডিটিভি





