Advertisement

বাসা ভাড়া নিয়ে ভাড়াটিয়া-বাড়িওয়ালার যেসব তথ্য জানা জরুরি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
বাসা ভাড়া নিয়ে ভাড়াটিয়া-বাড়িওয়ালার যেসব তথ্য জানা জরুরি
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিক্স

নিজের একটি নিরাপদ ঠিকানা সবারই প্রয়োজন। কিন্তু বাসা ভাড়া নেওয়া বা ভাড়া দেওয়ার সময় অনেকেই জানেন না, এ বিষয়ে বাংলাদেশে নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। ফলে প্রায়ই ভাড়া বাড়ানো, অতিরিক্ত অগ্রিম নেওয়া, রসিদ না দেওয়া কিংবা হঠাৎ বাসা ছাড়ার নোটিশ নিয়ে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।

অনেকেই মনে করেন, বাসা ভাড়া শুধু বাড়িওয়ালার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। বাস্তবে তা নয়। বাংলাদেশে বাসা ভাড়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হয় বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর মাধ্যমে। এই আইনে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয়ের অধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।

আপনি যদি বাসা ভাড়া নিতে চান অথবা বাড়িওয়ালা হয়ে থাকেন, তাহলে নিচের নিয়মগুলো জানা জরুরি।

বাসা ভাড়ার ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি করা কেন গুরুত্বপূর্ণ

আইনে লিখিত চুক্তির গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভাড়া, অগ্রিম টাকা, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল, বাসা ছাড়ার নোটিশ, মেরামতের দায়িত্বসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলে ভবিষ্যতে ভুল-বোঝাবুঝি কম হয়।

মৌখিক চুক্তির পরিবর্তে লিখিত চুক্তি করলে প্রয়োজন হলে সেটি আইনি প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।

এক মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়ার নিয়ম কী

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, ভাড়া নিয়ন্ত্রকের অনুমতি ছাড়া বাড়িওয়ালা এক মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া, জামানত, সেলামি বা প্রিমিয়াম নিতে পারেন না।

যদিও বাস্তবে অনেক জায়গায় কয়েক মাসের অগ্রিম নেওয়ার প্রচলন রয়েছে, তবে আইন অনুযায়ী এটি সব ক্ষেত্রে বৈধ নয়।

ইচ্ছেমতো কি ভাড়া বাড়ানো যায়

অনেক ভাড়াটিয়ার অভিযোগ, কয়েক মাস পরপরই বাসার ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আইন অনুযায়ী একই ভাড়াটিয়ার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে ভাড়া বাড়ানো উচিত নয়।

ভাড়া নিয়ে বিরোধ হলে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রকের কাছে আবেদন করে মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে।

ভাড়া দিলে রসিদ নেওয়া কেন জরুরি

প্রতি মাসে ভাড়া পরিশোধের পর বাড়িওয়ালার কাছ থেকে রসিদ নেওয়া উচিত।

আইন অনুযায়ী, বাড়িওয়ালা ভাড়া গ্রহণের পর রসিদ দিতে বাধ্য। রসিদ থাকলে ভবিষ্যতে ভাড়া পরিশোধ নিয়ে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে তা প্রমাণ হিসেবে কাজে আসে।

বর্তমানে অনেকেই ব্যাংক ট্রান্সফার বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধ করেন। সেক্ষেত্রে লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বাসা বসবাসের উপযোগী রাখা কার দায়িত্ব

বাড়ির মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা বাড়িওয়ালার দায়িত্ব। যেমন-

  • নিরাপদ পানি সরবরাহ
  • বিদ্যুতের ব্যবস্থা
  • পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা
  • ভবনের প্রয়োজনীয় মেরামত
  • বাসযোগ্য পরিবেশ বজায় রাখা

যদি জরুরি কোনো মেরামতের প্রয়োজন হয় এবং বারবার জানানোর পরও বাড়িওয়ালা ব্যবস্থা না নেন, তাহলে আইন অনুযায়ী ভাড়াটিয়া নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রতিকার চাইতে পারেন।

বাড়িওয়ালা কি যে কোনো সময় বাসা ছাড়তে বলতে পারেন

বাসা ভাড়ার চুক্তিতে সাধারণত বাসা ছাড়ার আগে নির্দিষ্ট সময়ের নোটিশের বিষয়টি উল্লেখ থাকে।

চুক্তির শর্ত না মেনে হঠাৎ করে ভাড়াটিয়াকে বাসা ছাড়তে বাধ্য করা বা হয়রানি করা আইনগত বিরোধের কারণ হতে পারে। তাই উভয় পক্ষেরই চুক্তির শর্ত মেনে চলা প্রয়োজন।

ভাড়াটিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব

ভাড়াটিয়ারও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। যেমন-

  • নির্ধারিত সময়ে ভাড়া পরিশোধ করা
  • বাসার যথাযথ ব্যবহার করা
  • ইচ্ছেমতো কাঠামোগত পরিবর্তন না করা
  • প্রতিবেশীদের অসুবিধা হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা
  • চুক্তির শর্ত মেনে চলা

বাড়িওয়ালার দায়িত্ব

বাড়িওয়ালারও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। যেমন-

  • বাসা বসবাসের উপযোগী রাখা
  • ভাড়া গ্রহণের পর রসিদ দেওয়া
  • আইন অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা
  • প্রয়োজনীয় মেরামতের ব্যবস্থা করা
  • ভাড়াটিয়ার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা

বিরোধ হলে কী করবেন

ভাড়া, অগ্রিম টাকা, ভাড়া বৃদ্ধি বা অন্যান্য বিষয়ে বিরোধ দেখা দিলে প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।

সমাধান না হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রকের কাছে অভিযোগ করা যায়। প্রয়োজন হলে আদালতের মাধ্যমেও আইনি প্রতিকার চাওয়া সম্ভব।

বাসা ভাড়া নেওয়ার আগে যেসব বিষয় যাচাই করবেন

  • লিখিত ভাড়ার চুক্তি করুন।
  • ভাড়ার পরিমাণ ও পরিশোধের তারিখ লিখে রাখুন।
  • অগ্রিম টাকার বিষয়টি স্পষ্ট করুন।
  • বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও সার্ভিস চার্জ কে বহন করবে, তা নিশ্চিত করুন।
  • বাসার বর্তমান অবস্থা দেখে নিন।
  • প্রতি মাসে ভাড়ার রসিদ সংগ্রহ করুন।
  • বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংরক্ষণ করুন।
  • প্রয়োজনে স্থানীয় থানার ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণ করুন।

সচেতন থাকলেই কমবে বিরোধ

বাসা ভাড়া নিয়ে অধিকাংশ সমস্যার মূল কারণ হলো আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং লিখিত চুক্তির অভাব। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয়েই যদি আইন মেনে চলেন এবং সব লেনদেন লিখিতভাবে সম্পন্ন করেন, তাহলে অপ্রয়োজনীয় বিরোধ অনেকটাই কমে আসবে। তাই বাসা ভাড়া নেওয়া বা দেওয়ার আগে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা রাখা প্রত্যেকের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন -১৯৯১

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন- ভাড়াটিয়ার অধিকারবিষয়ক নির্দেশিকা