আলজাজিরার কলাম/লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যু কি ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের অবস্থানে প্রভাব ফেলবে?

প্রয়াত মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম তার রাজনৈতিক জীবনের বেশির ভাগ সময় দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর পাশে কাটিয়েছেন। তারা হলেন সাবেক সিনেটর জন ম্যাককেইন ও জোসেফ লিবারম্যান। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই তিনজন ‘থ্রি অ্যামিগোস’ (তিন বন্ধু) নামে পরিচিত ছিলেন। শুধু গভীর বন্ধুতাই নয়, জায়নবাদ (ইহুদিবাদ) এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি তীব্র অনুরাগের কারণেও তারা তিনজন একসূত্রে গাঁথা ছিলেন।
লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ‘থ্রি অ্যামিগোস’-এর অধ্যায়ের অবসান ঘটল। মার্কিন কংগ্রেসে এখনো ইসরায়েলের অনেক বন্ধু আছেন। তবে ক্যাপিটল হিলে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় গ্রাহাম, ম্যাককেইন ও লিবারম্যান যে পরিমাণ শ্রম ও সময় ব্যয় করেছেন, তার সমকক্ষ খুব কম মানুষই আছেন।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই ত্রয়ীর শেষ সদস্য লিন্ডসে গ্রাহামের চলে যাওয়া কি ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের অবস্থানে কোনো প্রভাব ফেলবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মার্কিন রাজনীতিতে কোনো দেশের ‘অবস্থান’ বা ‘মর্যাদা’ বলতে আসলে কী বোঝায়, তা আমাদের প্রথমে বিশ্লেষণ করতে হবে। মার্কিন রাজনীতিতে এই অবস্থানের বিষয়টি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে উত্থানের পর থেকে ব্যাপকভাবে ওঠানামা করেছে।
নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলের মতোই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও এর ব্যবহার সম্পর্কে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। তিনি নিজেকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষ দিয়ে ঘিরে রেখেছিলেন। তার চারপাশে একদিকে যেমন ছিলেন কট্টর ডানপন্থি কৌশলী স্টিভ ব্যানন, যিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ঐতিহ্যগত ধারায় বিশ্বাসী ছিলেন; অন্যদিকে তেমনি ছিলেন সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন, যিনি ইরানে সরকার পরিবর্তনের কট্টর প্রবক্তা ছিলেন।
ট্রাম্প একসময় বুঝতে পারেন যে ঐতিহ্যগত ‘ডানপন্থি’ কাঠামোর মধ্যে নিজের অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টাটি আসলে সফল হয়নি। সম্ভবত এর খেসারত হিসেবেই তিনি ২০২০ সালের নির্বাচনে হেরে যান। এরপর তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করেন। তখন থেকে মার্কিন রাজনীতিতে কোনো দেশের ‘অবস্থান’ বা ‘গুরুত্ব’ মূলত ট্রাম্পের নিজস্ব স্বার্থ এবং নির্দিষ্ট কোনো চুক্তিতে তার চাহিদা পূরণ করার ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
তবে এত কিছুর মধ্যেও ইসরায়েল সবসময় একটি ব্যতিক্রমী অবস্থান ধরে রেখেছিল। এর পেছনে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দের চেয়ে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থা ও ক্ষমতার প্রভাব বেশি কাজ করেছে। প্রথমত, ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য এবং যৌথ অভিযানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কাজে লাগার কারণে ওয়াশিংটনের কাছে দেশটির কদর সবসময়ই ছিল।
দ্বিতীয়ত, ওয়াশিংটনের সবচেয়ে প্রভাবশালী লবিং গ্রুপগুলোর একটি হলো ‘আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি’ (আইপ্যাক)। কোনো প্রার্থীর প্রতি আইপ্যাকের সমর্থন থাকার অর্থ হলো তার নির্বাচনী প্রচারের তহবিলে বিপুল অঙ্কের অনুদান আসা। এটি যে কোনো প্রার্থীকে নির্বাচনের শুরুতেই প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে দেয়।
এভাবেই ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ট্রাম্প ও লিন্ডসে গ্রাহাম উভয়ের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়। এর ফলে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে লিন্ডসে গ্রাহাম একটি শক্তিশালী অবস্থান ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা পেয়েছিলেন।
ট্রাম্প যখন তার দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করেন, তখন লিন্ডসে গ্রাহাম ক্ষমতা বাড়াতে একটি বড় সুযোগ পান। তিনি নিজের পররাষ্ট্রনীতির অভিজ্ঞতা এবং আদর্শিক প্রতিশ্রুতি ট্রাম্পের সামনে তুলে ধরেন। ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সহায়তায় এই মার্কিন সিনেটর ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে জায়গা করে নেন। গ্রাহাম ট্রাম্পের একজন অত্যন্ত দক্ষ মুখপাত্র হিসেবে বিবেচিত হতেন, যাকে ট্রাম্প কখনো নিজের জন্য সরাসরি হুমকি মনে করতেন না।
তাহলে গ্রাহামের মৃত্যু কি ইসরায়েলের নীতিতে বা ট্রাম্পের দরবারে দেশটির সহজে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে? সাময়িকভাবে এর উত্তর হলো ‘হ্যাঁ’। গ্রাহাম সবসময় ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করতেন। তিনি তাদের মধ্যে সরাসরি ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত রাখতেন।
গ্রাহামের অবর্তমানে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটি এখন অনেক বেশি দুর্বল ও নড়বড়ে হয়ে পড়বে। কারণ এই সম্পর্কটি এখন পুরোপুরি অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাবে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে ইসরায়েলের নিজের দুর্বল অবস্থানের কারণে গ্রাহামের মৃত্যু খুব একটা বড় পার্থক্য গড়ে তুলবে না।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বন্ধু ও শত্রু সবার পরামর্শকে উপেক্ষা করেছেন। তিনি ইসরায়েলকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছেন, যেখানে দেশটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সম্পদের চেয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানে ট্রাম্পের যে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার পেছনে মূলত নেতানিয়াহুই দায়ী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন এই ঝামেলা থেকে বের হতে হিমশিম খাচ্ছেন। দ্রুত যুদ্ধ শেষ করা এবং এক অবিশ্বাস্য বিজয়ের যে আশ্বাস নেতানিয়াহু দিয়েছিলেন, তা এখন এক মরীচিকায় পরিণত হয়েছে।
পাশাপাশি ইসরায়েল বর্তমানে লেবানন ও গাজায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে তারা পশ্চিম তীরকে নিজেদের অংশ করে নেওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।
ইসরায়েলের এই উগ্র যুদ্ধংদেহী আচরণ বিশ্বমঞ্চে এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের নিজস্ব অবস্থানকে ধসিয়ে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তার বুলি এবং আইপ্যাকের রাজনৈতিক প্রভাব ওয়াশিংটনের ক্ষমতার অলিন্দে ইসরায়েলকে চিরকাল ব্যতিক্রমী অবস্থানে রাখতে সক্ষম নাও হতে পারে।
ইসরায়েলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো তাদের সবচেয়ে কট্টর মিত্রদের কাছেও এখন ধোঁয়াশা হয়ে উঠছে। এমতাবস্থায় ট্রাম্প কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে চিরদিন ইসরায়েলের পক্ষে থাকবেন, এমন ধারণা খুবই দুর্বল। যদি ওয়াশিংটনের নীতিগত কোনো চাপ না থাকে, তবে ট্রাম্পকে ধরে রাখা কঠিন হবে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে নিজের পক্ষে রাখার জন্য নেতানিয়াহুর কাছে দেওয়ার মতো আর কিছুই থাকবে না।
ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড এবং আত্মঘাতী আকাঙ্ক্ষা দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বেঁচে থাকলে লিন্ডসে গ্রাহামও হয়তো এই বাস্তবতায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারতেন না।
লেখক পরিচিতি:
ওরি গোল্ডবার্গ একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
.png)







