৬ বিঘার অনুমোদন নিয়ে ৩০ বিঘার শেয়ার বিক্রি করছে মাসুদ সাঈদীর ইস্তানবুল হোটেল

পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর আলোচিত ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ প্রকল্পে কেবল আর্থিক গরমিল নয়, জমি নিয়েও রয়েছে নানা জটিলতা। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তাদের প্রকল্প হবে ৩০ বিঘা জমির ওপর। অথচ এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় মাত্র ৬ বিঘা জমিতে হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণের জন্য প্রাথমিক অনুমতি নিয়েছে ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড’। গত ৭ জানুয়ারি কুয়াকাটা পৌরসভা থেকে এ অনুমোদন নেওয়া হয়। যদিও অনুমোদন পাওয়ার ছয় মাস আগেই ৩০ বিঘা প্রকল্পের গল্প শুনিয়ে শেয়ার বিক্রি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
ইস্তানবুল হোটেল কর্তৃপক্ষের দাবি, অনুমোদিত ৬ বিঘা জমির বাইরে আরও কিছু জমি বায়না করেছেন তারা। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বায়নাকৃত জমির ওপরেও রয়েছে বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা।
এশিয়া পোস্টে অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ৩০ বিঘা জমিতে প্রকল্প নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও ইস্তানবুলের মালিকানায় জমি রয়েছে এর পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম। প্রকল্পের জন্য এখনও পরিপূর্ণ অনুমোদনও পায়নি তারা। কুয়াকাটা পৌরসভা থেকে দেওয়া প্রাথমিক অনুমোদনের কাগজে আরও বেশকিছু শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা বেধে দেওয়া হয়েছে ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডকে।
এসব বিষয় সুরাহা করার আগে—প্রয়োজনীয় জমি না কিনেই ৩০ বিঘা হিসেবে প্রকল্পটিকে ৪৩ হাজার ৬০০ শেয়ারে ভাগ করা হয়েছে। এসব শেয়ার বিক্রির জন্য তৈরি করা হয়েছে ২৬ হাজার প্যাকেজ। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রায় ১০ হাজার প্যাকেজে অন্তত ২২ হাজার শেয়ার ইতোমধ্যে বিক্রি হয়েছে। অর্থ্যাৎ নিজেদের মালিকানায় ছয় বিঘা জমি থাকলেও এরচেয়ে দ্বিগুণ জমির শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে ইস্তানবুল হোটেল লিমিটেড।
জমি না কিনেই জমি বিক্রি
এশিয়া পোস্টের হাতে আসা নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড’ কুয়াকাটা পৌরসভা থেকে হোটেল নির্মাণের অনুমোদন নিয়েছে। অনুমোদনের জন্য পৌরসভায় জমা দেওয়া তপশিলে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পটি রয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৯২ একর বা ৫ দশমিক ৭৪ বিঘা জমি। এর বাইরে ওই এলাকায় আর কোনো জমি ইস্তানবুল হোটেলের নামে রেজিস্ট্রি হয়নি বলে নিশ্চিত হয়েছে এশিয়া পোস্ট।

এ বিষয়ে কুয়াকাটা পৌরসভার সচিব মো. জসিম উদ্দীনের সঙ্গে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। কিন্তু ইস্তানবুল হোটেল প্রকেল্পের বিষয়ে কথা বলতে খুব আগ্রহ দেখাননি তিনি। বরং ইস্তানবুল প্রকল্পের জমির বিষয়ে জানতে চাইলে কুয়াকাটা ‘পৌরসভায় নতুন যোগ দিয়েছেন তাই বিস্তারিত জানেন না’ বলে এড়িয়ে যান তিনি।
এদিকে এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করলে ইস্তানবুল হোটেল লিমিটেডের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজার মো. রাকিবুল ইসলাম দাবি করেন, ২১ বিঘা জমি কেনা হয়েছে আর বাকি ৯ বিঘার বায়না করা হয়েছে। কিন্তু এ সংক্রান্ত কোনো দলিল তিনি দেখাতে পারেননি। উল্টো ক্রেতারূপী প্রতিবেদককে রাকিবুল ইসলাম প্রশ্ন করেন, ‘কয়টি শেয়ার কিনবেন? এক-দুটি শেয়ার কিনলে জমি বায়নার কাগজপত্র দেখাতে পারব না। যারা নিচ্ছে বিশ্বাস করেই বুকিং মানি ও ডাউনপেমেন্ট দিচ্ছে।’
প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান তুহিনের বক্তব্যও অভিন্ন। তিনি বলেন, ‘যারা বিনিয়োগ করছেন তারা কেউই পূর্ণাঙ্গ দলিলাদি কিংবা এসব অনুমোদন দেখতে চায় না। শুধু বিশ্বাসের ওপর ভর করে প্রয়াত দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর পুত্র সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর বক্তব্য শুনে বিনিয়োগ করছেন।’
জমি নিয়েও জটিলতা
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধান বলছে, ইস্তানবুল হোটেল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডি এম এমদাদুল হক এখন পর্যন্ত কুয়াকাটায় ১৬ জনের কাছ থেকে ১৭ দশমিক ৫৫৯ বিঘা জমির বায়না দলিল করেছেন। তবে ওই জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পটুয়াখালীর খেপুপাড়া সাবরেজিস্ট্রি অফিস ওই বায়না রেজিস্ট্রির দলিলে শর্ত আরোপ করেছে। শর্ত অনুযায়ী, বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে অনুমতি পাওয়ার পর জমি হস্তান্তর করা যাবে, অন্যথা বয়না চুক্তির মেয়াদ বাড়বে।

এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদক কুয়াকাটায় সরেজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে জানতে পারেন, ইস্তানবুল হোটেলের বায়না করা জমির উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা দাবি করে পটুয়াখালী যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা করেছেন কাজলী বেগম, নাজমুন নাহার, মো. আসলাম ও মো. লিটন মিয়া নামে স্থানীয় চারজন বাসিন্দা। মামলা চলমান থাকায় ওই বিক্রি ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনারের অনুমোদন নেওয়ার শর্ত দিয়েছে রেজিষ্ট্রি অফিস।
এই চারজন ছাড়াও আরও একটি পক্ষ ওই জমির মালিকানা দাবি করেছে। এই দাবিদাররা হলেন কুয়াকাটার বালিয়াতলীর হাড়িপাড়া রাখাইন পল্লির বাসিন্দা। চলতি বছরের ২১ এপ্রিল কুয়াকাটার কলাপাড়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ওই জমির মালিকানা দাবি করেন রাখাইন পল্লির বাসিন্দা বোচান। তার দাবি, ইস্তানবুল কর্তৃপক্ষ যেখানে হোটেল-রিসোর্ট করার পরিকল্পনা করছে, ওয়ারিশ সূত্রে সেই জমির মালিকানা রাখাইন সম্প্রদায়ের। বোচানের অভিযোগ, সিএস, আরএস ও এসএতে রাখাইন সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষদের নামে ওই জমির রেকর্ডপত্র থাকলেও সেখানে সীমানা প্রাচীর দিচ্ছে প্রভাবশালীরা।

এর প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালের নভেম্বরে রাইখানদের পক্ষ থেকে পটুয়াখালী যুগ্ম জেলা জজ আদালত ও ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে (আদালতে) মামলা করেন রাখাইন বোচান। আব্দুল জব্বার হাওলাদার নামে যে ব্যক্তি নিজেকে দাতা দাবি করে ইস্তানবুল হোটেলের সঙ্গে ১৭ দশমিক ৫৫৯ বিঘা জমি বিক্রির বায়না করেছেন, বোচানের মামলায় সেই জব্বারকে প্রধান করে মোট ৮৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।
জমিসংক্রান্ত এসব জটিলতা নিয়ে এশিয়া পোস্ট কথা বলেছে ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হকের সঙ্গে। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত ১৯ একর জমি কিনেছি। তার মধ্যে অধিকাংশ সাবকবলা মূলে দলিল হয়েছে। কিছু আছে বায়না রেজিস্ট্রি।’
কিন্তু ছয় একরের অনুমোদন নিয়ে কেন বেশি জমির কথা বলে শেয়ার বিক্রি করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমে ১০ একরের ওপর পরিকল্পনা করেছিলাম। এখন সেটি এক্সটেনশন (বর্ধিত) হবে। এজন্য ২১ একর জমি নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’
রাখাইন সম্প্রদায়ের মালিকানা দাবির বিষয়ে ডি এম এমদাদুল হক বলেন, ‘এটি একদম ভুয়া, ভিত্তিহীন। তার কাছে ডকুমেন্ট চান, আমি চ্যালেঞ্জ করছি সে আপনাকে দিতে পারবে না। কারণ বিএস, আরএস, এসএ কোনোটাই তাদের কাছে নেই।’
হোটেল শেয়ার বিক্রিতে প্রতারণা করছে অনেকে
কক্সবাজার ও কুয়াকাটাসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় হোটেল-মোটেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শেয়ার বিক্রি করছে অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি কয়েকজন ভুক্তভোগী এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে গিয়ে প্রতারণা শিকার হয়েছেন বলে এশিয়া পোস্টের কাছে অভিযোগ জানান।
এমন অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত পায় এশিয়া পোস্ট। সেসব বিশ্লেষণের পর অন্তত নয়টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণও পেয়েছেন এশিয়া পোস্ট। এর মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে তাদের নিয়ে শুরু হয় বিস্তারিত অনুসন্ধান। সেই অনুসন্ধানের প্রথম পর্বে মঙ্গলবার (১৯ মে) ‘ইস্তাম্বুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড’ নিয়ে প্রথম সংবাদ প্রকাশ করে এশিয়া পোস্ট। এরই মধ্যে প্রতিবেদনটি দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় অনিয়মে জড়িত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েও পর্যায়ক্রমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে।





