ডেভিড ইমনের তিন সহযোগীর ছবি ও পরিচয় প্রকাশ

চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া তিন সহযোগীর ছবি ও নাম-পরিচয় প্রকাশ করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাত ৪টার দিকে যশোর শহরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গ্রেপ্তার হওয়া ডেভিড ইমনের তিন সহযোগী হলেন ঢাকা শ্যামপুর থানার ২২৭/৩ পরি মোল্লারবাগ জুরাইন এলাকার জাফরের ছেলে আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল, কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ এলাকার মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে মো. শামিম ও নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি থানার সাহারপাড়া গ্রামের মৃত বেলায়েত হোসেনের ছেলে সাফায়েত হোসেন।
পুলিশ জানায়, এই তিনজনের মধ্যে আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা। অপর দুজনের মধ্যে শামিম ঢাকার মতিঝিল থানার ৯১/১/এ আরকে মিশন রোডের একটি বাসায় বসবাস করে আসছিলেন। সাফায়েত হোসেন যাত্রাবাড়ীর গোলাপবাগ পুলিশ কোয়াটারের পেছনে ২৫/ই নাহার ভিলায় বসবাস করেন।
যশোরের পুলিশ সুপার (এসপি) সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঝুমঝুমপুর এলাকায় নজরদারি ও চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার সকাল ১০টার দিকে তাদের চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশ ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর গ্রামের বাসিন্দা মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড চট্টগ্রামের ইমন সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। চট্টগ্রামের একাধিক আলোচিত হত্যা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় তার নাম বিভিন্ন সময় আলোচনায় আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র হাতে তার একাধিক ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত হন।
গত বছরের ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরা এক্সেস রোডের মুখে প্রাইভেট কারে গুলি করে জোড়া খুন, ২৩ মে পতেঙ্গা সৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবরকে খুন এবং ৫ নভেম্বর সরোয়ার হোসেন বাবলা খুনের ঘটনায় মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের নাম সামনে আসে।
এরপর চলতি বছরের ১৩ জুলাই চট্টগ্রামে ‘ডিজিটাল ডটনেট (ডিডিএন)’ নামে ইন্টারনেট সেবার এক কোম্পানিতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর এবং ৩৫ লাখ টাকা ও মালপত্র লুটের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসেন ডেভিড ইমন।
ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলার পর ডেভিড ইমনকে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে এশিয়া পোস্ট। অনুসন্ধানে উঠে আসে–আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘থ্রি-টায়ার’ সিন্ডিকেটের তথ্য।
অপরাধ বিশ্লেষক ও সিএমপির গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে চট্টগ্রামের এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি সুনির্দিষ্ট ‘থ্রি-টায়ার’ বা তিন স্তরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পাওয়া গেছে। এই চক্রটি মূলত ভয়ের ওপর ভিত্তি করে কোটি কোটি টাকার অপরাধ সাম্রাজ্য ছড়াচ্ছে।
প্রথম স্তর (রিমোট কন্ট্রোল মাস্টারমাইন্ড): এই স্তরের শীর্ষে আছেন সাজ্জাদ হোসেন খান (বড় সাজ্জাদ) এবং হাবীব খানের মতো আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। তারা বর্তমানে ফ্রান্স বা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে বা আত্মগোপনে আছেন। কোনো পুঁজি বা শারীরিক ঝুঁকি ছাড়াই, শুধু ইন্টারনেট কলিং অ্যাপ ব্যবহার করে তারা ওপার থেকে কল করেন এবং চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দিলে কী পরিণতি হবে, তার রূপরেখা এরাই তৈরি করে।
দ্বিতীয় স্তর (হোয়াইট কলার ইনফর্মার): এই স্তরটি সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং চেনা কঠিন। এর মধ্যে রয়েছেন সমাজের কিছু পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, এমনকি রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণসামগ্রীর দোকানের কর্মচারী। এ ছাড়া এক বা একাধিক ফিগার যারা উঠতি সন্ত্রাসী—যেমন ডেভিড ইমন (উদ্ধৃতিতে ডেবিট ইমন রয়েছে) কিংবা রায়হান এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত। এদের কাজ শুধু কল করা, তবে কোনো ঘটনাস্থলে তারা সরাসরি যায় না। আপনি কোন এলাকায় নতুন বাড়ি করছেন, কোন ব্যাংক থেকে কত টাকার এলসি খুলেছেন, আপনার সন্তান কোন স্কুলে পড়ে—এই সব নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশে বসে থাকা ‘বড় ভাই’দের কাছে পাঠিয়ে দেয় এই স্তরটি। তথ্য নিখুঁত হওয়ার কারণেই ব্যবসায়ীরা প্রথম ফোনেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
তৃতীয় স্তর (লোকাল হিট স্কোয়াড): এরা মূলত স্থানীয় অভ্যাসগত অপরাধী, কিশোর গ্যাং সদস্য বা ভাসমান ‘টোকাই’। এদের সঙ্গে মূল গডফাদারদের কোনো সরাসরি যোগাযোগ থাকে না। মাঝখানের দালালদের মাধ্যমে এদের মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে ভাড়া (হায়ার) করা হয়। এদের কাজ শুধু নির্দেশিত বাড়ি বা গাড়িতে ঢিল মারা, আগুন দেওয়া বা ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক তৈরি করা। এরা নিজেরাও জানে না তারা কার জন্য বা কেন এই কাজ করছে।
.png)






