দুই দ্বীপ উপজেলার সি-অ্যাম্বুলেন্স অকেজো, নৌপথে জীবন-মৃত্যুর লড়াই

লোকমান হাকিম, কক্সবাজার
দুই দ্বীপ উপজেলার সি-অ্যাম্বুলেন্স অকেজো, নৌপথে জীবন-মৃত্যুর লড়াই
মহেশখালী জেটিঘাটের পূর্বপাশের খালে নোঙর করে রাখা সি-অ্যাম্বুলেন্সটি জোয়ারের পানিতে ভাসে এবং ভাটায় কাদায় আটকে পড়ে। ছবি : এশিয়া পোস্ট

কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দেওয়া হয়েছিল দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরিচালন ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোটি কোটি টাকার অ্যাম্বুলেন্স দুটি অচল হয়ে পড়ে আছে। ফলে তিন বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে আবারও কাঠের ট্রলার ও সাধারণ নৌযানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন এই দুই দ্বীপ উপজেলার বাসিন্দারা।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, রাত-বিরাতে মুমূর্ষু ও প্রসূতি রোগীদের জেলা সদর কক্সবাজারে নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষায় প্রতিকূল আবহাওয়া ও নৌযান সংকটের কারণে জীবনের ঝুঁকি তৈরি হয়।

কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেওয়া সি-অ্যাম্বুলেন্সটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্প (এলজিএসপি) এবং কুতুবদিয়ার সি-অ্যাম্বুলেন্সটি বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা রিসার্চ ট্রেনিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ইন্টারন্যাশনালের (আরটিএমআই) মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল। এগুলো কেনা হয়েছিল আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে। পরে অ্যাম্বুলেন্স দুটি সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, ‘২০১৭ সালে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এলজিএসপি প্রকল্পের আওতায় চালক, সহকারী, জ্বালানি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করা হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স দুটি সচল রাখা যায়নি।’

পরিচালন ব্যয় বেশি, মিলছে না সাড়া

মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, মহেশখালী-কক্সবাজার আট কিলোমিটার নৌপথে রোগী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত সি-অ্যাম্বুলেন্সটি ২০২৩ সালের মে মাসে সরবরাহ করা হয়েছিল। চালুর পর ২০২৩ সালে ৮৫ জন এবং ২০২৪ সালে ১৭৯ রোগীকে কক্সবাজারে আনা-নেওয়া করা হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. ফাহিম শাহরিয়ার শাওন বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজারে রেফার করতে হয়। এর মধ্যে মুমূর্ষু ও জটিল গাইনি রোগীও থাকে। অনেক সময় রাতের বেলায় সিজারিয়ান রোগীকেও পাঠাতে হয়।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, মহেশখালী জেটিঘাটের পূর্বপাশের খালে নোঙর করে রাখা সি-অ্যাম্বুলেন্সটি জোয়ারের পানিতে ভাসে, আর ভাটায় কাদায় আটকে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকলেও এটি দেখভালের কেউ নেই।

মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহফুজুল ইসলাম বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সটিতে ১৫০ লিটার অকটেন ও ৫ লিটার মবিল দিলে চারবার যাওয়া-আসা করা যায়। একবার যাওয়া-আসার খরচ প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। এটি একসঙ্গে ৮ থেকে ১০ জন রোগী বহন করতে সক্ষম। এটি ৪০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন। তবে অ্যাম্বুলেন্সটি ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর আর চালু রাখা যায়নি।’

তিনি জানান, অ্যাম্বুলেন্সটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ইনক্লুসিভ সার্ভিসেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ (আইএসও) প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করতে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে এখনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। চলতি জুলাই মাসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।

মহেশখালীর বাসিন্দা মাহবুব রোকন বলেন, ‘দ্বীপ এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা এখনও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে সি-অ্যাম্বুলেন্স বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় জটিল রোগীদের জেলা সদরে পৌঁছাতে কোনো নৌযানও পাওয়া যায় না।;

অকেজো ব্যাটারি, ডুবছে জোয়ারে

কুতুবদিয়ায় দেওয়া সি-অ্যাম্বুলেন্সটির অবস্থা আরও শোচনীয়। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার পর চলতি ২০২৬ সালের মে মাসে বড়ঘোপ ঘাটে জোয়ারের পানিতে সেটি তলিয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে অ্যাম্বুলেন্সটি কোনো কাজে আসেনি। জটিল রোগী নিয়ে সাড়ে তিন কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিতে প্রকৃতির ওপর নির্ভর করতে হয় তাদের।

কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ জেটিঘাটের উত্তর পাশে দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্সটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ছবি : এশিয়া পোস্ট
কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ জেটিঘাটের উত্তর পাশে দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্সটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ছবি : এশিয়া পোস্ট

সরেজমিনে বড়ঘোপ জেটিঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জ্বালানি ও জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্সটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। বড়ঘোপ ঘাটের টোল আদায়ের দায়িত্বে থাকা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সটি কার্যত কখনোই জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা দিতে পারেনি। এটি এখন কেউ দেখাশোনাও করে না।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, কুতুবদিয়ার ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাস। ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ১২টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও উন্নত চিকিৎসা সুবিধার অভাবে রোগীদের সাগরপথে চট্টগ্রাম বা কক্সবাজার যেতে হয়।

কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল হাসান বলেন, ‘সাড়ে তিন বছর আগে একটি ঘূর্ণিঝড়ে অ্যাম্বুলেন্সটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে সরবরাহকারী সংস্থা সেটি সংস্কার করে দেয়। বর্তমানে এর ব্যাটারির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত জাতীয় নির্বাচনের সময় নৌবাহিনী অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহার করতে চেয়েছিল, কিন্তু সেটি অকেজো থাকায় ব্যবহার সম্ভব হয়নি। একবার যাওয়া-আসায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকার জ্বালানি প্রয়োজন হয়, এ ব্যয় বহন করা আমাদের পক্ষে কঠিন। গত ডিসেম্বর মাসে বিশ্বব্যাংক, আইওএম ও ইউনিসেফকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা নতুন করে অর্থায়নে আগ্রহ দেখায়নি।’

সমাধানের অপেক্ষায় দ্বীপবাসী

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, ‘সি-অ্যাম্বুলেন্স দুটি সচল রাখতে নতুন প্রকল্প বা বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। আবারও চিঠি দেওয়া হবে। পাশাপাশি আইএসও প্রকল্পের আওতায় পরিচালনার সুযোগ আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা সি-অ্যাম্বুলেন্সগুলো দ্রুত সচল করা হোক। অন্যথায় জরুরি চিকিৎসাসেবার অভাবে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের জীবনঝুঁকি আরও বাড়বে।’