Advertisement

কাগজপত্রে অসঙ্গতি, তদন্ত না করে চীনা নাগরিককে মেহেরপুর ছাড়তে সহযোগিতা পুলিশের

এশিয়া পোস্ট নিউজ, মেহেরপুর
কাগজপত্রে অসঙ্গতি, তদন্ত না করে চীনা নাগরিককে মেহেরপুর ছাড়তে সহযোগিতা পুলিশের
অভিযুক্ত চীনা নাগরিক জাং ডং শেং ওরফে মোহাম্মদ আলী এবং তার দাবি করা স্ত্রী কেয়া খাতুন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ধর্মান্তরের দাবি, বিয়ের নথিতে একের ওপর এক অসঙ্গতি, আইনজীবীর সিল-স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ, তার ওপর নেই বিদেশি নাগরিকের বিয়ের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক অনাপত্তিপত্র (এনওসি)। এতসব অভিযোগের পরও পুলিশের সহযোগিতায় মেহেরপুর ছেড়েছেন আলোচিত চীনা নাগরিক জাং ডং শেং ওরফে মোহাম্মদ আলী এবং তার দাবি করা স্ত্রী কেয়া খাতুন। পুরো ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

এরই মধ্যে এশিয়া পোস্টের হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, পুলিশের ইউনিফর্ম পরা এক সদস্য এবং ট্রাফিক পুলিশের পোশাক পরিহিত আরেক ব্যক্তি ওই দম্পতিকে মেহেরপুর শহরের পুরাতন পোস্ট অফিসপাড়ার একটি ভাড়া বাসা থেকে বের করে একটি রেন্ট-এ-কারের মাইক্রোবাসে তুলে দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর গাড়িটি মেহেরপুর ত্যাগ করে।

জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে শহরের ওই পাঁচতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন জাং ডং শেং ও কেয়া খাতুন। খবর পেয়ে সাংবাদিকরা সেখানে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিয়ে, ধর্মান্তর ও পরিচয়সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করেন। এ সময় এফিডেভিট, ম্যারেজ সার্টিফিকেট ও নিকাহনামায় একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে, ওই দম্পতির উপস্থাপিত হলফনামায় মেহেরপুর জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রূতশোভা মণ্ডলের নাম, সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে। তবে অ্যাডভোকেট রূতশোভা মণ্ডল স্পষ্টভাবে জানান, তিন বছরেও তিনি কোনো বিদেশি নাগরিকের বিয়েসংক্রান্ত হলফনামা সম্পাদন করেননি। তার নাম, সিল ও স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

অন্যদিকে সদর উপজেলার নিকাহ রেজিস্ট্রার আব্দুল মাবুদ নান্নু জানান, বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকের বিয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) বাধ্যতামূলক। কিন্তু ওই দম্পতি কোনো বৈধ এনওসি দেখাতে পারেনি। একই সঙ্গে তারা চীনে তিন মাস থাকার দাবি করলেও কারও কাছে পাসপোর্ট ও ভিসা প্রদর্শন করেননি।

পুলিশের সহযোগিতায় মেহেরপুর ছাড়েন অভিযুক্ত চীনা নাগরিক। ছবি: সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া
পুলিশের সহযোগিতায় মেহেরপুর ছাড়েন অভিযুক্ত চীনা নাগরিক। ছবি: সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া

এসব প্রশ্নের উত্তর মেলার আগেই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাদের ওই ভবন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ভবনের কেয়ারটেকার বেল্টু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার দুপুরে তারা (দম্পতি) ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। পরে সাংবাদিকরা এসে কথা বলেন। এরপর সদর থানার এসআই আনিসুর রহমান এসে তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং নিজ দায়িত্বে একটি রেন্ট-এ-কারের গাড়ি ঠিক করে মাগরিবের নামাজের আগেই তাদের এখান থেকে নিয়ে যান।’

সদর থানার এসআই আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমি কাগজপত্র যাচাই করতে যাইনি। কিছু লোক তাদের কাছে চাঁদা দাবি করছে, এমন অভিযোগ পেয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে গিয়েছিলেন এসআই অরুণ। চীনা নাগরিক ও তার স্ত্রী নিরাপত্তাজনিত কারণে এলাকা ছাড়তে চাইলে আমি শুধু গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছি।’

অন্যদিকে এসআই অরুণ বলেন, ‘আমি কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য গিয়েছিলাম। তবে যাচাইয়ের দায়িত্ব ছিল ডিএসবি সদস্যদের। চীনা নাগরিকের গতিবিধি পুলিশকে জানানোর জন্য বাড়ির কেয়ারটেকারকে নির্দেশ দিয়ে আমি চলে এসেছিলাম।’

এফিডেভিট ও কাগজপত্র জাল হওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যদি কাগজপত্র জাল হয়ে থাকে, তাহলে এটি তো অবশ্যই একটি গুরুতর ধরনের বিষয়।’

এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন। যাদের উপস্থাপিত নথির সত্যতা নিয়েই গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে, যাদের বিয়ের আইনি বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে, তাদের বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কেন জেলা ছাড়তে সহযোগিতা করা হলো? তারা বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন—এ প্রশ্নেরও নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেনি পুলিশ।

এ বিষয়ে মেহেরপুর জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পারসন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খানের কাছে জানতে চাইলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। একইভাবে পুলিশ সুপারকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

পরে বিষয়টি খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমানকে জানানো হলে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ের। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার বা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বক্তব্য দেবেন। রেঞ্জ ডিআইজির বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই।’

এদিকে পুরো ঘটনাটি নিয়ে মেহেরপুরজুড়ে তীব্র আলোচনা চলছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি উপস্থাপিত নথিগুলোর বৈধতা নিয়ে এত গুরুতর সন্দেহ থাকে, তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কীভাবে পুলিশের উপস্থিতি ও সহযোগিতায় ওই চীনা নাগরিক জেলা ত্যাগ করলেন?

বিষয় :মেহেরপুর