পরীক্ষা ছাড়াই রাজশাহীর নির্বাচন অফিসে নিয়োগ পেলেন ১৪৩ জন

পরীক্ষা ছাড়াই রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছেন ১৪৩ জন আউটসোর্সিং কর্মী। জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেডের মাধ্যমে তাদের বাছাই করা হয়। নিয়োগ পাওয়া একাধিক ব্যক্তি এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছেন, চাকরির জন্য কেএসএফ ট্রেডার্সকে জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে তাদের।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই আগে থেকে নির্বাচন অফিসে দৈনিক মজুরি বা অস্থায়ীভিত্তিতে কর্মরত ছিলেন। পরে টাকার বিনিময়ে তাদের একই কর্মস্থলে আউটসোর্সিং কর্মী দেখিয়ে নতুন চুক্তির আওতায় নেওয়া হয়।
এই নিয়োগে কোনো উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসের ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) পদ্ধতিতে কাজ দেওয়া হয় কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেডকে।
সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ডিপিএম একটি ব্যতিক্রমধর্মী পদ্ধতি। বিশেষ পরিস্থিতি, জরুরি প্রয়োজন কিংবা আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলেই সাধারণত এ পদ্ধতি ব্যবহার হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে ১৪৩ জন আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগে কী জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি সংশ্লিষ্টদের কাছে।
পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীরা আবেদনেরই সুযোগ পাননি।
১১৭ কর্মী থেকে বেড়ে ১৪৩
বুশরা সিকিউরিটি সার্ভিসেস (প্রা.) লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি চলাকালে প্রথমে ৫ জন গাড়িচালক, ৬৯ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ৪৩ জন নিরাপত্তাপ্রহরীসহ মোট ১১৭ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে তালিকায় যুক্ত হন আরও ২৬ জন নিরাপত্তাপ্রহরী। এতে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪৩।
নথি অনুযায়ী, রাজশাহী নির্বাচন অফিসের অস্থায়ী কর্মীদের বড় অংশের চুক্তির মেয়াদ ছিল গত ৩০ জুন পর্যন্ত। এর আগে ১৪ জুন নির্বাচন কমিশন সচিবালয় একটি নির্দেশনা দেয়।
সেখানে বলা হয়, চলমান চুক্তির মেয়াদ শেষে নতুন করে সেবা নিতে হবে। সেক্ষেত্রে আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০২৫, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ এবং প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ অনুসরণ করতে হবে। এই নির্দেশনার পর ডিপিএম পদ্ধতিতে কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেডকে কাজ দেওয়া হয়।
কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চাকরি বহাল থাকবে এবং ভবিষ্যতে বাদ দেওয়া হবে না—এমন আশ্বাসে জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
জনপ্রতি গড়ে ৭৫ হাজার টাকা করে হিসাব করলে ১৪৩ জনের কাছ থেকে নেওয়া টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত একাধিক ব্যক্তি এশিয়া পোস্টকে কেএসএফের নিয়োগ বাণিজ্যের কথা জানিয়েছেন।
একজন বলেছেন, ‘চাকরি স্থায়ী থাকবে এবং ভবিষ্যতে বাদ দেওয়া হবে না—এমন আশ্বাসে আমাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। রাজশাহীর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানালে তিনি উল্টো কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে বাধ্য হয়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে চাকরি নিতে হয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মী বলেন, ‘পুরো সিস্টেম ছিল সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। নির্বাচন কর্মকর্তারা সরাসরি টাকা না নিলেও কোম্পানির সঙ্গে তাদের যোগসাজশ ছিল বলে আমাদের ধারণা। কারণ যারা টাকা দেয়নি, তাদের অনেকের চাকরি হয়নি।’
সড়ক অবরোধ চাকরিপ্রত্যাশীদের
১৪৩ জন আউটসোর্সিং তালিকাভুক্ত চাকরিপ্রত্যাশীকে গত ৬ জুলাই নিয়োগপত্র নিতে ডাকা হয় কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেডের শ্যামলী কার্যালয়ে। সেখানে গেলে তাদের কাছে নিয়োগপত্রের বিনিময়ে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা চাওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে চাকরিপ্রত্যাশীরা অফিসের সামনে সড়ক অবরোধ করেন। একপর্যায়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
চাকরিপ্রত্যাশীরা এশিয়া পোস্টকে জানান, কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেডের প্রতিনিধিরা তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। শেষ পর্যন্ত ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
রাজশাহীর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিছুর রহমানের দাবি, নিয়োগের ক্ষেত্রে লেনদেনের বিষয়ে তিনি অবগত নন।
নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ডিপিএম একটি ব্যতিক্রমধর্মী পদ্ধতি। সাধারণত বিশেষ পরিস্থিতি, জরুরি প্রয়োজন কিংবা আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। আমরাও সেটিই করেছি। জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেড আমাদের তিনটি অঞ্চলে কাজ করছে। সবকিছু বিবেচনা করে তাদের কাজ দেওয়া হয়েছে।’
কেএসএফ ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামীম হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের আগের টেন্ডারের মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হয়েছে। পুনরায় ই-টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গেলে নিয়োগ সম্পন্ন করতে দুই থেকে তিন মাস সময় লেগে যেত। এতে করে নির্বাচন অফিসের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার এবং কর্মরত শ্রমিকদের কয়েক মাস বেতনহীন থাকার আশঙ্কা ছিল। তাই অফিসের গতিশীলতা বজায় রাখতে এবং শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে সরাসরি নিয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ করে বিদ্যমান কর্মীদের বহাল রাখা হয়েছে। এখানে আমাদের হাতে কিছু নেই। নির্বাচন কমিশন জনবল চেয়েছে, আমরা দিয়েছি।’
লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা আমরা তৈরি করিনি। রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিসুর রহমান স্যার ৩০ জুন আমাদের একটি তালিকা দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী চুক্তি হয়েছে। যেহেতু কোনো নতুন লোক নিয়োগ দেওয়া হয়নি এবং পুরোনো কর্মীরাই তাদের পদে বহাল আছেন, তাই এখানে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ বা কারণ নেই। তবে প্রতিষ্ঠানের অগোচরে ব্যক্তিগতভাবে কেউ টাকা নিয়ে থাকলে তার দায় প্রতিষ্ঠানের নয়।’
রাজধানীর শ্যামলীতে কেএসএফের কার্যালয়ের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের বিষয়ে শামীম হোসেন বলেন, ‘এক দিনে সব নিয়োগপত্র দেওয়া সম্ভব ছিল না। কিছু প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এ ছাড়া রাজশাহীর স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতা তাদের পছন্দের ২০-৩০ জনকে ওই তালিকায় ঢোকানোর জন্য অনৈতিক চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত তালিকার বাইরে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ না থাকায় ওই পক্ষটি হট্টগোল তৈরি করে।’
তদন্ত দাবি
নিয়োগে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা না থাকা, ডিপিএম পদ্ধতি ব্যবহারের যৌক্তিকতা এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এটি ইতিবাচকভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। তাই এই প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে দোষীদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’
.png)







