মঞ্চে অভিষেক হলো মেহেরান তিথি

বঙ্গরঙ্গ নাট্যদলের সপ্তম প্রযোজনা মৃত্যুহীন প্রাণ’ মঞ্চস্থ হলো শুক্রবার (১০ জুলাই)। প্রখ্যাত নাট্যকারের বহুল আলোচিত একাঙ্ক নাটক ‘মৃত্যুর অতীত’ অবলম্বনে নির্মিত এই প্রযোজনার নবনাট্যায়ন ও নির্দেশনা দিয়েছেন মিথুন মোস্তফা। আলোক ও সংগীত পরিকল্পনায় ছিলেন আসিফ মুনীর।
সমসাময়িক রাজনৈতিক নাট্যচর্চার প্রেক্ষাপটে ‘মৃত্যুহীন প্রাণ’ একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রযোজনা হিসেবে দর্শক ও নাট্যবোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। উৎপল দত্তের নাট্যভাবনার কেন্দ্রে থাকা মার্কসবাদী দর্শন, শ্রেণিসংগ্রাম, রাষ্ট্রক্ষমতার অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বিষয়গুলোকে নির্দেশক সমকালীন নাট্যভাষায় নতুন ব্যাখ্যায় উপস্থাপন করেছেন।
প্রযোজনাটিতে মৃত্যু কেবল একটি জৈবিক পরিণতি হিসেবে নয়; বরং ক্ষমতার কাঠামো, সামাজিক বাস্তবতা এবং মানুষের অস্তিত্বসংকটের একটি শক্তিশালী রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে । নাটকের ঘটনাপ্রবাহ মৃত্যুর পরবর্তী বাস্তবতাকে অলৌকিকতার আশ্রয়ে নয়, বরং বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার অসঙ্গতি ও বৈপরীত্য উন্মোচনের নাট্যকৌশল হিসেবে নির্মাণ করেছে।
মঞ্চায়নের নন্দনতত্বেও ছিল স্বাতন্ত্র্যের ছাপ। ব্রেখটীয় এপিক থিয়েটারের বিভিন্ন কৌশল বিশেষ করে এলিয়েনেশন এফেক্ট এবং ব্রেকিং দ্য ফোর্থ ওয়াল সচেতনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে দর্শক আবেগে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত না হয়ে নাটকের রাজনৈতিক ও দার্শনিক বক্তব্যকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছেন। শিল্পীদের সরাসরি দর্শকের সঙ্গে সংলাপ স্থাপনের মাধ্যমে নাটকের আদর্শিক অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। দলগত অভিনয়ের সমন্বয় প্রযোজনাটিকে একটি পরিণত রাজনৈতিক নাট্যভাষা প্রদান করেছে। বিশেষ করে দৃশ্যান্তরের ছন্দ, প্রতীকী উপস্থাপন এবং মঞ্চব্যবহারে নির্দেশকের নির্মাণশৈলী দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করে।
এই প্রযোজনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল মেহেরান তিথির মঞ্চে আনুষ্ঠানিক অভিষেক ‘মৃত্যুহীন প্রাণ’-এ তার প্রথম অভিনয় দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। নবাগত হলেও আত্মবিশ্বাসী মঞ্চ উপস্থিতি, সংলাপ পরিবেশন এবং চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়েছে। এবং তিনি প্রখ্যাত নাট্যকার-উৎপল দত্তের আরেকটি আলোচিত নাটক ‘উন্মোচন’-এ ‘জুলেখা’ চরিত্রে অভিনয় করবেন। বঙ্গরঙ্গ নাট্যদলের প্রযোজনায় নির্মাণাধীন এই নাটকটি অতি শিগগিরই মঞ্চে আসবে বলে জানিয়েছে নাট্যদল।
প্রদর্শনী শেষে দীর্ঘ করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে মিলনায়তন। নাট্যপ্রেমী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, ‘মৃত্যুহীন প্রাণ’ কেবল একটি নাট্যপ্রযোজনা নয়; বরং সমকালীন সমাজ, রাজনীতি এবং মানবিক সংকট নিয়ে ভাবনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে।




