ইবলিস জিন নাকি ফেরেশতা

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ইবলিস জিন নাকি ফেরেশতা
আরবিতে ‘ইবলিস’ আঁকা ক্যালিগ্রাফি। ছবি: সংগৃহীত

আল্লাহর সৃষ্টিতে প্রথমে ছিল ফেরেশতা ও জিন। এরপর মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে। ইবলিস আগুনের তৈরি। সে থাকত ফেরেশতাদের সঙ্গে। একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করত। প্রশ্ন হলো, এই ইবলিস জিন নাকি ফেরেশতা?

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সেজদা করো। তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সেজদা করল। সে দম্ভভরে প্রত্যাখ্যান করল। ফলে সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৪)

কোরআনের এই আয়াতে ইবলিসকে ফেরেশতাদের সঙ্গে সেজদা করতে আদেশ করা হয়েছে। তাই কারও মনে প্রশ্ন জাগে, ইবলিস কি ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত?

ইবলিস জিনদের একজন। তার মৌলিক উপাদান আগুন। ইমাম রাজি (রহ.) তিনটি দলিল উপস্থাপন করে বলেছেন, ‘ইবলিসের জিন প্রমাণিত হওয়ার জন্য এই দলিলগুলোই যথেষ্ট।’ (আত-তাফসিরুল কাবির, ফখরুদ্দিন রাজি, খণ্ড: ২ পৃষ্ঠা: ৪২৯-৩০)

এক. আগুন থেকে ইবলিসকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কোরআনে আছে, ইবলিস বলেছে, ‘আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে আর তাকে (আদমকে) সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১২)। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি (আল্লাহ) জিন জাতিকে ধোঁয়াহীন আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রহমান, আয়াত: ১৫)। আগুন থেকে জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে। এদিকে ফেরেশেতাদের মৌলিক উপাদান হলো আলো। তাই ইবলিস ফেরেশতাদের দলভুক্ত নয়। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘নুর বা আলো থেকে ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়াহীন আগুন থেকে। আর তোমাদের বলা হয়েছে আদম-সৃষ্টির বিবরণ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৬)

দুই. ফেরেশতাদের স্ত্রী-সন্তান নেই। তাদের মধ্যে নেই নারী-পুরুষের বিভাজন। তারা এসব থেকে মুক্ত। কিন্তু ইবলিসের ছেলে-মেয়ে আছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি তাকে (ইবলিসকে) এবং তার বংশধরকে আমার পরিবর্তে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করছ?’ (সুরা কাহফ, আয়াত: ৫০)

তিন. ফেরেশতা আল্লাহর সব আদেশ মেনে চলে। কিন্তু ইবলিস আল্লাহর আদেশ মানেনি। আল্লাহ বলেন, ‘তারা (ফেরেশতারা) কখনও আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না। বরং যেই কাজে তাদের নিয়োজিত করা হয়েছে, সবসময় সেই কাজই করে।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৬)

মানুষ সৃষ্টির আগে সৃষ্টির সেরা ছিল ফেরেশতারা। আল্লাহ যখন সেই ফেরেশতাদের আদম (আ.)-কে সেজদার আদেশ করলেন, তখন তাদের থেকে নিম্নস্তরের জিনও সেই আদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে, এটাই স্বাভাবিক। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘সুতরাং আমি যখন আদমের সৃষ্টি শেষ করব এবং তাঁর মধ্যে রুহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তাঁর সামনে সেজদায় পড়ে যেয়ো।’ (সুরা সাদ, আয়াত: ৭২)

হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ জান্নাতে আদমের প্রতিকৃতি তৈরি করে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত রেখে দেন। ইবলিস আদমের মাটির প্রতিকৃতির চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখল এর মধ্যে ফাঁকা আছে। সে বুঝতে পেরেছিল এটা এমন এক সৃষ্টি, যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬১১)। বোঝা গেল, আদম সৃষ্টির সব ঘটনা ইবলিসের উপস্থিতিতেই হয়েছে। আদম (আ.)-কে সবার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া, তাকে সেজদার আদেশ দেওয়ার সময়ও ইবলিস ফেরেশতাদের মজলিসে ছিল। তাই ইবলিস ফেরেশতা না হলেও সে ওই আদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে।

আবার আল্লাহ যখন ইবলিসকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘(হে ইবলিস) আমি আদেশ করার পরও কিসে তোমাকে সেজদা থেকে বিরত রাখল।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১২)

উত্তরে সে বলেছিল, আমি আদমের চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে আর তাঁকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। সে এটা বলেনি, হে আল্লাহ, আপনি তো আমাকে আদেশ করেননি। (সুরা আরাফ, আয়াত: ১২)

আল্লাহ কোরআনের অধিকাংশ জায়গায় ইবলিসকে শয়তান বলে সম্বোধন করেছেন।