নানান দেশের নতুন বছরের যত উৎসব

নানান দেশের নতুন বছরের যত উৎসব
ছবি : সংগৃহীত

আমাদের বাঙালিদের জন্য দিনটি নির্ধারিত, ১৪ এপ্রিল। বৈশাখের শুরু। বছর শেষের বিদায়ী সূর্যের আলো মিলিয়ে যাওয়া আর চৈত্রসংক্রান্তির সঙ্গে সঙ্গেই নববর্ষের আবহ চলে আসে বাংলার চারপাশে। পরদিন ভোরে নতুন বছরের শুরু থেকেই বৈশাখের প্রাণোচ্ছল উৎসব হয়ে ওঠে জমজমাট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নতুন বছর ১ জানুয়ারি ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’ দিয়ে শুরু করে বটে, আবার আমাদের পহেলা বৈশাখের মতো নিজস্ব নববর্ষ পালনের রেওয়াজও রয়েছে বিভিন্ন দেশে। সেসব উৎসবের সময় কিছু দেশে ক্যালেন্ডারের তারিখেই নির্দিষ্ট, আবার কিছু কিছু পালিত হয় মৌসুম বা লুনার ক্যালেন্ডারের সময় অনুযায়ী।  

১ জানুয়ারির সর্বজনীন নববর্ষ

১ জানুয়ারির উদযাপন বিদায়ী বছরের শেষ দিনের রাত থেকেই জমে ওঠে। ‘থার্টিফাস্ট নাইটের’ রাত ১২টার কাউন্টডাউন, আতশবাজি আর উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষ নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। নিউইয়র্কের টাইমস স্কোয়ার বা অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হারবারের মতো জায়গাগুলো বিশ্বজুড়ে নববর্ষ উদযাপনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

চীনা নববর্ষ: পরিবার, খাবার আর সৌভাগ্য

bigStoryContent

চীনা নববর্ষ বা লুনার নিউ ইয়ার একেক বছর ভিন্ন ভিন্ন দিনে হয়, কারণ এটি চাঁদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নির্ধারিত। এ উৎসব প্রায় ১৫ দিন ধরে চলে। ঘর পরিষ্কার করা হয় পুরোনো দুর্ভাগ্য দূর করার প্রতীক হিসেবে। এ উৎসবের লাল রঙের সাজসজ্জা, ড্রাগন নাচ, আতশবাজি - সবই সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। বিশেষ খাবারেরও গুরুত্ব আছে এ আনন্দ উৎসবে। ডাম্পলিং, নুডলস, মাছ প্রতিটি খাবারেরই রয়েছে আলাদা অর্থ, যেমন দীর্ঘ জীবন বা সমৃদ্ধি।

নওরোজ: বসন্তের নতুন জীবন

bigStoryContent

মধ্য এশিয়া ও ইরান অঞ্চলে পালিত ‘নওরোজ’ আসে বসন্তের শুরুতে। এটি শুধু নতুন বছর নয়, বরং প্রকৃতির পুনর্জন্মের প্রতীক। মানুষ ‘হাফত-সিন’নামে একটি বিশেষ টেবিল সাজায়, যেখানে সাতটি প্রতীকী জিনিস রাখা হয়। প্রতিটি জীবনের আলাদা দিককে বোঝায়, যেমন স্বাস্থ্য, সম্পদ, ভালোবাসা ইত্যাদি।

থাইল্যান্ডের সংক্রান: পানির উৎসব

bigStoryContent

থাইল্যান্ডের সংক্রান (১৩–১৫ এপ্রিল) পুরোপুরি পানিকে ঘিরে অনুষ্ঠিত হয়। মানুষ একে অপরকে পানি ছিটিয়ে পুরোনো বছরের দুঃখ ও দুর্ভাগ্য ধুয়ে ফেলার প্রতীকী আনন্দে মেতে ওঠেন। বর্তমানে এটি এক ধরনের বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে, যেখানে পর্যটকরাও অংশ নেয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় বৈশাখী আবহ

বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখের মতোই ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পয়লা বৈশাখ পালিত হয়। এছাড়া পাঞ্জাবে বৈশাখী, শ্রীলঙ্কায় আলুথ আভুরুদু - সবই প্রায় একই সময়ে পালিত হয়। এটি প্রমাণ করে, কৃষিভিত্তিক সমাজে নতুন বছর অনেক সময় ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে জড়িত।

ব্রাজিল: সাদা পোশাকে নতুন আশা

bigStoryContent

ব্রাজিলে নতুন বছরের রাতে মানুষ সাদা পোশাক পরে, যা শান্তি ও সৌভাগ্যের প্রতীক। অনেকেই সমুদ্রের ঢেউয়ে সাতবার লাফ দেয় এবং ফুল ভাসিয়ে শুভকামনা জানায়। এই প্রথা আফ্রিকান ও স্থানীয় সংস্কৃতির মিশ্রণ থেকে এসেছে।

ইথিওপিয়ান নববর্ষ: এনকুটাটাশ

bigStoryContent

ইথিওপিয়ায় এনকুটাটাশ পালিত হয় সাধারণত ১১ সেপ্টেম্বর। এটি বর্ষার শেষ এবং নতুন ঋতুর শুরুকে নির্দেশ করে। এই দিনে শিশুরা ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়, আর মানুষ গানে-নাচে মেতে ওঠে। এটি অনেকটা আমাদের পহেলা বৈশাখের মতোই প্রকৃতি ও জীবনের নতুনত্বকে উদযাপন করে।

নেপালের নববর্ষ: বিক্রম সংবৎ

bigStoryContent

নেপালে বিক্রম সংবৎ এপ্রিল মাসেই পালিত হয়, যা পহেলা বৈশাখের খুব কাছাকাছি সময়। এই সময় রাস্তায় উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পারিবারিক আনন্দে ভরে ওঠে পুরো দেশ।

কোরিয়ান নববর্ষ: সোল্লাল

bigStoryContent

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে নতুন বছরের উৎসবে পালন হয় নানা অদ্ভুত ও মজার রীতি। ডেনমার্কে বন্ধুদের দরজায় পুরোনো প্লেট ভাঙা হয় সৌভাগ্যের জন্য। স্পেনে রাত ১২টায় ১২টি আঙুর খাওয়া হয়—প্রতিটি মাসের জন্য একটি করে। জাপানে মন্দিরের ঘণ্টা ১০৮ বার বাজানো হয়, যা মানুষের ১০৮টি পাপ থেকে মুক্তির প্রতীক। স্কটল্যান্ডে ‘ফার্স্ট-ফুটিং’ প্রথা আছে, নতুন বছরে প্রথম অতিথি সৌভাগ্য বয়ে আনে। ফিলিপাইনে গোলাকার ফল খাওয়া হয়, যা অর্থ ও সমৃদ্ধির প্রতীক।

প্রতিটি দেশের ইতিহাস, ধর্ম, আবহাওয়া আর সংস্কৃতি ভিন্ন। নতুন বছর উদযাপনের ধরনও আলাদা। তবুও একটি জায়গায় সবাই এক—নতুন বছর মানেই আশা, পরিবর্তন আর নতুন করে বাঁচার ইচ্ছা।