দুধ সাদা কিন্তু মাখন হলুদ কেন, জানেন কী

মাখন অনেকেরই প্রিয় খাবার। গরম পরোটা, টোস্ট বা ভাতের সঙ্গে এক টুকরা মাখন খাবারের স্বাদই বদলে দেয়। কিন্তু কখনও কি ভেবেছেন, দুধের রং যেখানে সাদা, সেখানে সেই দুধ থেকেই তৈরি মাখনের রং কেন হলুদ?
বিষয়টি অনেকের কাছেই অবাক করার মতো। তবে এর পেছনে রয়েছে খুবই সহজ একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। মজার বিষয় হলো, এই রঙের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক আছে গরুর খাবারের।
গরুর খাবারই বদলে দেয় মাখনের রং
গরু যখন ঘাস খায়, তখন ঘাসের মধ্যে থাকা বিটা-ক্যারোটিন নামের একটি প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থ তার শরীরে প্রবেশ করে। বিটা-ক্যারোটিনই মূলত গাজর, মিষ্টি কুমড়া বা মিষ্টি আলুর কমলা বা হলুদ রঙের জন্য দায়ী।
এই বিটা-ক্যারোটিন গরুর দুধের চর্বির মধ্যে জমা হয়। পরে সেই চর্বি থেকেই যখন মাখন তৈরি করা হয়, তখন মাখন হালকা হলুদ রং ধারণ করে।
তাহলে দুধ সাদা থাকে কেন?
এখানেই রয়েছে আসল রহস্য।
দুধে সাধারণত মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ চর্বি থাকে। ফলে এতে থাকা বিটা-ক্যারোটিনের পরিমাণ এত কম যে তা দুধের রং বদলাতে পারে না। দুধের অন্যান্য উপাদান, বিশেষ করে প্রোটিন ও পানির কারণে দুধ সাদা দেখায়।
কিন্তু মাখনে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই চর্বি। ফলে বিটা-ক্যারোটিনের ঘনত্ব অনেক বেশি হয়ে যায় এবং তখন সেটি স্পষ্টভাবে হলুদ রং তৈরি করে।
সব মাখনের রং কি একই রকম? উত্তর হলো না। মাখনের রং নির্ভর করে গরুর খাদ্যাভ্যাসের ওপর।
যেসব গরু বেশি ঘাস খায়, তাদের দুধের মাখন সাধারণত বেশি হলুদ হয়। আর যেসব গরুর খাবারে ভুট্টা, খড় বা অন্যান্য খাদ্যের পরিমাণ বেশি থাকে, তাদের মাখনের রং তুলনামূলক ফ্যাকাশে বা হালকা ক্রিম রঙের হয়।
এ কারণেই অনেক সময় আইরিশ বা ইউরোপের ঘাস খাওয়া গরুর মাখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মাখনের তুলনায় বেশি গাঢ় হলুদ দেখা যায়।
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গেও রং বদলাতে পারে
বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে গরু বেশি তাজা ঘাস খায়। ফলে এ সময়ের মাখন তুলনামূলক বেশি হলুদ হয়।
অন্যদিকে শীতকালে গরুর খাদ্যে তাজা ঘাস কম থাকায় মাখনের রং কিছুটা ফ্যাকাশে হতে পারে। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
হলুদ মাখনের স্বাদ কি আলাদা?
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বেশি বিটা-ক্যারোটিনযুক্ত মাখনের স্বাদ কিছুটা সমৃদ্ধ ও গভীর হতে পারে। বিশেষ করে টোস্ট, রুটি বা বিস্কুটের ওপর সরাসরি মাখন মাখিয়ে খেলে এই পার্থক্য কিছু মানুষের কাছে বোঝা যায়।
তবে রান্না বা বেকিংয়ে এই স্বাদের পার্থক্য সাধারণত খুব একটা টের পাওয়া যায় না।
মাখনে কি কৃত্রিম রং মেশানো হয়?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে না। তবে কিছু প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মাখনের রং আরও আকর্ষণীয় করতে অ্যানাটো নামের একটি প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ রঞ্জক ব্যবহার করে। এটি একটি গাছের বীজ থেকে পাওয়া যায় এবং খাদ্যে ব্যবহারের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত।
যদি কোনো মাখনে এই উপাদান ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি সাধারণত প্যাকেটের উপাদান তালিকায় উল্লেখ থাকে।
কখন বুঝবেন মাখন নষ্ট হয়ে গেছে?
ভালো মাখনের রং সাধারণত সাদা, ক্রিম বা হলুদ হয়ে থাকে।
যদি মাখনে ধূসর, বাদামি বা অস্বাভাবিক কালচে দাগ দেখা যায়, কিংবা গন্ধে পরিবর্তন আসে, তাহলে সেটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমন মাখন খাওয়া উচিত নয়।
মাখনের স্বাদ কোন বিষয়গুলো নির্ধারণ করে?
মাখনের মান ও স্বাদের ওপর কয়েকটি বিষয় প্রভাব ফেলে। যেমন - গরুর খাদ্যাভ্যাস, গরুর জাত, মাখন তৈরির পদ্ধতি, সংরক্ষণের সময় ও পরিবেশ এবং বাতাসের সংস্পর্শে থাকার সময়।
অনেক দিন সংরক্ষণ করা মাখনের স্বাদ ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। তাই সবসময় ভালোভাবে মোড়ানো অবস্থায় ফ্রিজে সংরক্ষণ করা উচিত।
দুধ থেকে মাখন তৈরি হলেও তাদের রঙের পার্থক্যের মূল কারণ হলো চর্বির পরিমাণ এবং গরুর খাদ্যে থাকা বিটা-ক্যারোটিন। তাই মাখনের হলুদ রং কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়, বরং এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক একটি বৈশিষ্ট্য। পরেরবার টোস্টে মাখন মাখানোর সময় হয়তো এই ছোট্ট বৈজ্ঞানিক রহস্যটিও আপনার মনে পড়ে যাবে।
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট






