চুল পড়ছে নাকি পাতলা হচ্ছে, পার্থক্য বুঝলে সমাধানও হবে সহজ

অনেক সময় চুল পড়ার সমস্যা এত ধীরে ধীরে শুরু হয় যে প্রথমে তা চোখেই পড়ে না। একদিন বালিশে কয়েকটি চুল, আরেকদিন চিরুনিতে একটু বেশি। গোসলের পর ড্রেনেও জমে থাকে কিছু চুল। শুরুতে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হলেও একসময় মনে হতে পারে, চুল কি আগের চেয়ে বেশি পড়ছে?
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ধরনের চুল পড়া এক রকম নয়।
অনেকেই চুল পড়া এবং চুল পাতলা হয়ে যাওয়াকে একই সমস্যা মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কারণ, এর কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসার ধরনও ভিন্ন।
দুবাইভিত্তিক নান্দনিক চিকিৎসা ও অ্যান্টি-এজিং বিশেষজ্ঞ ডা. বুশরা মিরের মতে, চুল ঝরে পড়া বা হেয়ার শেডিং সাধারণত সাময়িক সমস্যা। অন্যদিকে চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা হেয়ার থিনিং ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
হেয়ার শেডিং কী?
প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ চুল পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো কারণে একসঙ্গে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি চুল পড়তে শুরু করলে তাকে হেয়ার শেডিং বলা হয়।
ডা. বুশরা মির জানান, এ সময় চুলের গোড়া নষ্ট হয় না। শুধু স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চুল বিশ্রাম পর্যায়ে চলে যায় এবং পরে ঝরে পড়ে। তাই মূল কারণ দূর হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নতুন চুল গজায়।
হেয়ার শেডিংয়ের সাধারণ কারণগুলো হলো
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ
- জ্বর বা বড় ধরনের অসুস্থতা
- হরমোনের পরিবর্তন
- সন্তান জন্মের পর শরীরের পরিবর্তন
- কঠোর ডায়েট
- শরীরে আয়রন বা অন্যান্য পুষ্টির ঘাটতি
- খুব দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
- ঋতু পরিবর্তন
হেয়ার থিনিং কী?
হেয়ার থিনিং একদিনে শুরু হয় না। এটি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
এ ক্ষেত্রে শুধু চুল পড়ে না, নতুন যে চুল গজায় সেটিও আগের তুলনায় অনেক সরু, দুর্বল এবং পাতলা হয়। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাথার চুলের ঘনত্ব কমতে থাকে।
ডা. বুশরা মিরের মতে, এর পেছনে সাধারণত যেসব কারণ থাকে সেগুলো হলো-
- বংশগত বৈশিষ্ট্য
- অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের প্রতি অতিসংবেদনশীলতা
- বয়স বাড়া
- দীর্ঘদিনের হরমোনজনিত সমস্যা
- মাথার ত্বকে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ
চুল পড়া আর চুল পাতলা হওয়ার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
হেয়ারস্টাইলিস্ট সামির আলহাসান বিষয়টি খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, হেয়ার শেডিং হলো সংখ্যার সমস্যা। অর্থাৎ একসঙ্গে অনেক চুল পড়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে হেয়ার থিনিং হলো চুলের গুণগত মানের সমস্যা। হয়তো ড্রেনে খুব বেশি চুল দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু নতুন যে চুল গজাচ্ছে তা আগের তুলনায় অনেক সরু, দুর্বল এবং ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে।
কীভাবে বুঝবেন আপনার চুল ঝরছে?
হেয়ার শেডিং হলে সাধারণত যেসব লক্ষণ দেখা যায়-
- হঠাৎ করে অনেক বেশি চুল পড়া
- গোসলের সময় একগুচ্ছ চুল ঝরে পড়া
- চিরুনিতে অনেক চুল জমে থাকা
- বালিশ বা কাপড়ে প্রচুর চুল পাওয়া
- সাময়িকভাবে চুলের ভলিউম কমে যাওয়া
কীভাবে বুঝবেন চুল পাতলা হয়ে যাচ্ছে?
হেয়ার থিনিংয়ের লক্ষণগুলো একটু ভিন্ন। এর মধ্যে রয়েছে-
- সিঁথি আগের তুলনায় চওড়া হয়ে যাওয়া
- কপালের সামনের চুল ধীরে ধীরে কমে যাওয়া
- চুলের ঘনত্ব কমে যাওয়া
- নতুন চুল অনেক সরু হওয়া
- উজ্জ্বল আলোতে মাথার ত্বক বেশি দেখা যাওয়া
সামির আলহাসানের ভাষায়, এই পরিবর্তন খুব ধীরে ধীরে হয়। তাই অনেকেই শুরুতে বুঝতে পারেন না।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, হেয়ার শেডিং সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে কমে আসে, যদি শরীরের মূল সমস্যা ঠিক হয়ে যায়।
কিন্তু যদি ছয় মাস পরও একইভাবে চুল পড়তে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আর যদি চুল ধীরে ধীরে পাতলা হতে থাকে, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা শুরু করা ভালো। কারণ চুলের ফলিকল যত দ্রুত দুর্বল হয়, তত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সেটিকে রক্ষা করার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।
দুই সমস্যার চিকিৎসা এক নয়
সামির আলহাসান বলেন, অনেক মানুষ এই দুটি সমস্যাকে এক মনে করে একই ধরনের চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু এটি বড় ভুল।
তার ভাষায়, ব্রণের চিকিৎসা যেমন শুধু ময়েশ্চারাইজার দিয়ে হয় না, তেমনি হেয়ার শেডিং আর হেয়ার থিনিংয়ের চিকিৎসাও এক হতে পারে না।
হেয়ার শেডিং হলে কী করবেন?
ডা. বুশরা মিরের মতে, প্রথমে চুল পড়ার মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এরপর যেসব বিষয়ের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে-
- পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া
- আয়রন ও প্রয়োজনীয় ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ করা
- মানসিক চাপ কমানো
- শরীরকে স্বাভাবিকভাবে নতুন চুল গজানোর সুযোগ দেওয়া
সামির আলহাসান আরও কিছু পরামর্শ দেন।
- খুব টানটান করে চুল বাঁধা এড়িয়ে চলুন
- সিল্কের বালিশের কভার ব্যবহার করতে পারেন, এতে চুলে ঘর্ষণ কম হয়
- অযথা চুলে অতিরিক্ত টান পড়ে এমন স্টাইল এড়িয়ে চলুন
হেয়ার থিনিং হলে কী করবেন?
হেয়ার থিনিংয়ের চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো চুলের ফলিকলকে সক্রিয় রাখা এবং আরও ক্ষতি হওয়া থেকে রক্ষা করা।
এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি যত্ন প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মিনোক্সিডিলযুক্ত স্ক্যাল্প সিরাম ব্যবহার করা হয়।
এ ছাড়া উন্নত মানের রোজমেরি অয়েলসমৃদ্ধ কিছু স্ক্যাল্প কেয়ার পণ্যও মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, যা ফলিকলকে পুষ্টি জোগাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা শুরু করার আগে অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চুল পড়া মানেই সব সময় একই সমস্যা নয়। কারও ক্ষেত্রে এটি সাময়িকভাবে বেশি চুল ঝরে পড়া, আবার কারও ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার লক্ষণ।
তাই সমস্যার ধরন আগে বুঝতে পারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক কারণ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসাও হয় আরও কার্যকর। আর দীর্ঘদিন চুল পড়া বা চুল পাতলা হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
সূত্র: ভগ






